নলবাড়ির প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে পদ্মশ্রী পর্যন্ত; আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কলা নির্দেশক নুরুদ্দিন আহমেদের বর্ণময় শিল্পযাত্রা

Story by  Ariful Islam | Posted by  Aparna Das • 1 h ago
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছ থেকে পদ্মশ্রী পুরস্কার গ্রহণ করছেন নুরুদ্দিন আহমেদ
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছ থেকে পদ্মশ্রী পুরস্কার গ্রহণ করছেন নুরুদ্দিন আহমেদ
 
আরিফুল ইসলাম / গুয়াহাটি

প্রতিভা, সততা এবং একাগ্রতা থাকলে কোনও বাধাই মানুষকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে বাধা দিতে পারে না, এরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্প নির্দেশক নুরুদ্দিন আহমেদ। একটি অত্যন্ত প্রত্যন্ত ও দুর্গম গ্রাম থেকে শুরু হওয়া তাঁর যাত্রা সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি ভবনের মঞ্চে পৌঁছে স্পর্শ করেছে সাফল্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি, ‘পদ্মশ্রী’ সম্মান।

নুরুদ্দিন আহমেদ তাঁর কাজ, নিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের সাধনার মাধ্যমে সমাজকে মূল্যবান অবদান দিয়ে এসেছেন। এই সম্মান কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং সমগ্র রাজ্যের শিল্প-সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা এবং কঠোর পরিশ্রমের এক জাতীয় স্বীকৃতি। নীরবে নিজের কাজ করে চলা এই শিল্পীর জীবনযাত্রা আজ অসংখ্য নবীন প্রজন্মের কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
 

গত মঙ্গলবার নয়াদিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে অনুষ্ঠিত এক গম্ভীর অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে সম্মানজনক পদ্মশ্রী পুরস্কার গ্রহণ করেন শিল্পী নুরুদ্দিন আহমেদ। শিল্প ও সংস্কৃতির জগতে তাঁর দীর্ঘদিনের অসামান্য ও মূল্যবান অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়। তাঁর কর্ম, নিষ্ঠা এবং দীর্ঘ সাধনার মাধ্যমে সমাজের জন্য করা অবদান এই সম্মানের মাধ্যমে যথাযথ মর্যাদা লাভ করেছে।
 
‘আওয়াজ-দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে শিল্প নির্দেশক বলেন, “আমি ভারত সরকার এবং অসম সরকারের প্রতি গভীর আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি একজন সাধারণ মানুষ, গ্রামের মানুষ এবং একজন সাধারণ শিল্পী। আমাকে এই সম্মানের যোগ্য বলে বিবেচনা করায় আমি সত্যিই আনন্দিত। আমি অনুভব করছি, এই স্বীকৃতি সমাজের প্রতি আমার দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিল।”
 
নিজের দীর্ঘ শিল্পযাত্রার স্মৃতিচারণ করে তিনি আরও বলেন, “গত ৫০ বছর ধরে আমি এই শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত। নলবাড়ির একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকেই আমার এই যাত্রা শুরু হয়েছিল। আমার প্রথম গুরু ছিলেন প্রয়াত আদ্য শর্মাদেব। পরে আমি মুম্বইয়ে যাই এবং তারপর লখিমপুরে গুরু চন্দ্রকমল বরদলৈয়ের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করি। ১৯৮১ সাল থেকে প্রায় দুই বছর দিল্লিতে আধুনিক ভাস্কর্য এবং পাপেট্রির কাজ শিখেছিলাম।”
 
শিল্প নির্দেশক তাঁর দুই পুত্রকেও এই পথেই এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। বর্তমানে তাঁর দুই পুত্রই পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এই ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করেছেন। গর্বিত পিতা নুরুদ্দিন আহমেদ বলেন, “এখন আমার দুই ছেলেই আমার চেয়েও ভালো কাজ করে। থিয়েটার, নাটক এবং চলচ্চিত্র জগতেও তারা নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করেছে। বিশেষ করে মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের জন্মস্থান বরদোয়ায় তারা যে শিল্পকর্ম করেছে, তা অসমের মানুষ অত্যন্ত ভালোবেসেছে।”
 
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের সঙ্গে ভাস্কর নুরুদ্দিন আহমেদ এবং তাঁর পুত্র দীপ আহমেদ
 
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা কনিষ্ঠ পুত্র দীপ আহমেদ এই মুহূর্তটিকে পরিবারের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “এই সম্মান আমাদের জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি। বাবার সারাজীবনের সাধনার এটি সর্বোত্তম স্বীকৃতি। মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি ভবনে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বাবার পদ্ম পুরস্কার গ্রহণের মুহূর্তটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের ছিল। পুরস্কার গ্রহণের পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের উদ্যোগে আয়োজিত নৈশভোজে আমরা দেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাই। সেখানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গেও আমাদের সাক্ষাৎ হয়। সবচেয়ে ভালো লেগেছে এই কারণে যে, আমরা যখন খাবার খাচ্ছিলাম, তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল আমাদের সঙ্গে একই টেবিলে বসে আহার গ্রহণ করেন। পুরো দিনটিই ছিল আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবময়।”
 
রাষ্ট্রপতি ভবনের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে শিল্পীকে দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে অভিনন্দন জানানোর জন্য উপস্থিত ছিলেন তাঁর স্ত্রী জুনু রাজখোয়া, কনিষ্ঠ পুত্র দীপ আহমেদ এবং বড় পুত্রবধূ রস্না দেবী।
 
শৈশব থেকেই মনের মধ্যে জন্ম নেওয়া রঙিন কল্পনাগুলিকে নিজের হাতের স্পর্শে বাস্তব রূপ দেওয়া এই শিল্পীর জন্ম নলবাড়ি জেলার হাতিকুঁচিতে। একাগ্র সাধনা, নিরলস প্রচেষ্টা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি অসংখ্য অনন্য সৃষ্টি গড়ে তুলেছেন। ভ্রাম্যমাণ থিয়েটারের ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ৪৫০টিরও বেশি ভ্রাম্যমাণ নাটকের মঞ্চসজ্জা এবং দেশের বিভিন্ন ভাষার প্রায় ৫,৬০০টি নাটকে শিল্প নির্দেশনার মাধ্যমে তিনি এক বিরল রেকর্ড গড়েছেন। শুধু তাই নয়, জাতীয় স্তরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শিল্প প্রকল্পেও তাঁর দক্ষতার স্বাক্ষর রয়েছে।
 
নুরুদ্দিন আহমেদের জাদুকরী স্পর্শে প্রাণ ফিরে পেয়েছে বহু ঐতিহাসিক স্মারক, কালজয়ী দৃশ্যপট, ধ্রুপদী শিল্পকর্ম এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পূর্ণাবয়ব মূর্তি। সম্প্রতি তিনি সম্পূর্ণ নিজের খরচে লুইতকণ্ঠ জুবিন গার্গের একটি সুউচ্চ পূর্ণাবয়ব মূর্তি নির্মাণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। তাঁর হাতেই প্রাণ পেয়েছিল এই অসাধারণ মূর্তিটি। সাধারণত কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয়সাপেক্ষ এমন একটি মূর্তি তিনি মাত্র আঠারো দিনের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমে নিজের অর্থে নির্মাণ করেন। জুবিন গার্গের এক মাসের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের সঙ্গে মিল রেখে তিনি এই শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছিলেন।
 
এছাড়াও, নুরুদ্দিন আহমেদের হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ পায় গুয়াহাটির বৃহৎ দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলি। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার দ্বিতীয় মেয়াদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আকর্ষণীয় মঞ্চটিও তিনি তাঁর দুই পুত্রের সহযোগিতায় নির্মাণ করেছিলেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে অসমের শিল্প-সংস্কৃতিকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে অসম সরকার যে বিভিন্ন শিল্পসজ্জা প্রস্তুত করেছিল, তার নেতৃত্বও দিয়েছিলেন নুরুদ্দিন আহমেদ।
 
ভাস্কর নুরুদ্দিন আহমেদের পুত্র দীপ আহমেদ, তাঁর স্ত্রী এবং পুত্রবধূ
 
মহাভারতের পাণ্ডব রাজ্যের রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থ, ‘দ্য গ্রেট ওয়াল অব চায়না’, রোমের ‘কলোসিয়াম’-সহ নানা বিস্ময়কর স্থাপত্য নিপুণতার সঙ্গে নির্মাণ করে খ্যাতি অর্জন করা এই শিল্পীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও সমানভাবে সুদূরপ্রসারী। তিনি জানান, “আমার বাসভবনের কাছে কাহিলীপাড়ায় একটি নিজস্ব জাদুঘর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি একটি আর্ট স্কুলও শুরু করার চিন্তাভাবনা করছি, যা চলতি বছরের মধ্যেই চালু করতে পারব বলে আশা রাখি।”
 
তাঁর প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা কাহিলীপাড়ার ‘রাজদ্বীপ স্টুডিও’ আজ বহু নবীন শিল্পী ও ভাস্করকে তাঁদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি জীবিকা অর্জনের পথও খুলে দিয়েছে। কঠোর পরিশ্রম এবং একাগ্রতার সঙ্গে শিল্পসাধনায় ব্রতী এই শিল্পীকে ২০০৫ সালে নাটকের মঞ্চসজ্জার জন্য ‘কমল লাল মেমোরিয়াল পুরস্কার’ এবং ২০১৭ সালে মর্যাদাপূর্ণ ‘সংগীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। এত সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও তাঁর সাধারণ জীবনযাপন এবং অমায়িক স্বভাব সকলের হৃদয় জয় করে চলেছে।
 
নলবাড়ির এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু হওয়া নুরুদ্দিন আহমেদের এই বর্ণময় শিল্পযাত্রা শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, সমগ্র অসমীয়া জাতির জন্য এক অমূল্য সম্পদ এবং গর্বের বিষয়। শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং আত্মনিবেদনের এই যাত্রা বারবার প্রমাণ করে যে, যিনি নিজের নিষ্ঠাবান কর্মের মাধ্যমে সমাজকে সমৃদ্ধ করেন, সময় নিজেই তাঁকে স্বীকৃতি দেয়। জীবদ্দশায় নিজের শ্রম ও সাধনার এমন সর্বোচ্চ জাতীয় স্বীকৃতি লাভ করা একজন শিল্পীর জন্য নিঃসন্দেহে জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং পবিত্র অর্জন। নুরুদ্দিন আহমেদের জীবনগাথা আগামী প্রজন্মকে যুগের পর যুগ স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সাহস জোগাবে।