স্বর্ণপদকজয়ী চিকিৎসকের মানবসেবার ব্রত, গ্রামের মানুষের পাশে ডাঃ এম এম শামীম ও তাঁর সহযোদ্ধারা

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
ডাঃ এম এম শামীম
ডাঃ এম এম শামীম
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

প্রচণ্ড গরমে যখন জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত, তখন শহরের চৌহদ্দি ছেড়ে গ্রামের সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়ালেন একদল তরুণ চিকিৎসক। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল বিষয় নিয়ে সচেতনতা শিবির সাধারণত শহরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু হাওড়ার ডোমজুড়ের ভূমিপুত্র, স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট নিউরোলজিস্ট ডাঃ এম এম শামীম সেই প্রচলিত ধারণাকেই বদলে দিয়েছেন।
 
দেশের অন্যতম সেরা স্নায়ুরোগ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান নিমহ্যানস (NIMHANS)-এর অল ইন্ডিয়া র‍্যাঙ্ক ১ প্রাপ্ত ও গোল্ড মেডেলজয়ী এই তরুণ চিকিৎসকের উদ্যোগে ডোমজুড়ের গ্রামীণ এলাকায় আয়োজিত হল এক বিশেষ স্বাস্থ্য সচেতনতা ও নিউরো-জাগরণ কর্মসূচি। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে উপস্থিত হন নিমহ্যানসের আরও কয়েকজন কৃতী চিকিৎসক, ডাঃ এস রহমান, ডাঃ এস গৌরব এবং ডাঃ আলোকমোহন। সকলেই নিজেদের ব্যস্ত পেশাগত জীবনের মধ্যেও সময় বের করে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে গ্রামের মানুষের জন্য এই উদ্যোগে অংশ নেন।
 

শিবিরের মূল উদ্দেশ্য  স্নায়ুরোগ সম্পর্কে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা দূর করা এবং সাধারণ মানুষকে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া। আলোচনায় উঠে আসে এমন বহু প্রশ্ন, যা গ্রামীণ সমাজে দীর্ঘদিন ধরে ভুল ধারণার জন্ম দিয়েছে। ‘স্পাইনের রোগ মানেই কি অপারেশন?’, ‘স্ট্রোক হলে কি সারাজীবন শুধু ওষুধ খেয়েই থাকতে হবে?’, ‘স্নায়ুরোগের প্রাথমিক লক্ষণ কী?’ এই ধরনের নানা প্রশ্নের সহজ ভাষায় উত্তর দেন চিকিৎসকেরা।
 
আলোচনা শেষে ছিল দীর্ঘ প্রশ্নোত্তর পর্ব। গ্রামের সাধারণ মানুষ তাঁদের ব্যক্তিগত সমস্যার কথাও তুলে ধরেন। চিকিৎসকেরা ধৈর্য সহকারে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন। ডাঃ শামীম বলেন, “গ্রামের মানুষদের অনেকেই নিউরোলজিক্যাল সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন নন। তাঁদের গাইড করার মতো কাউকেও অনেক সময় পাওয়া যায় না। ফলে রোগ ধরা পড়তে দেরি হয় এবং চিকিৎসাও পিছিয়ে যায়। আমরা চাই মানুষ সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার কাছে পৌঁছতে পারুন।”
 
একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার মুহূর্তে ডাঃ এম এম শামীম
 
শুধু নিউরোলজির সচেতনতাই নয়, বর্তমান তীব্র গরম ও তাপপ্রবাহের পরিস্থিতিতে হিট স্ট্রোক প্রতিরোধ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। এইভাবে প্রয়োজনে সব সময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দেন তারা। এই চিকিৎসকের দল আরো বলেন যে তারা এভাবেই বারবার প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে এসে দাঁড়াবেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। পৌঁছে দেবেন তাদের সেবা সবার কাছে। মাঠে-ঘাটে কাজ করা কৃষক, শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষকে জানানো হয় কীভাবে গরমের মধ্যে শরীরকে সুরক্ষিত রাখতে হবে, কী কী উপসর্গ দেখলে সতর্ক হতে হবে এবং কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
 
ডাঃ এম এম শামীমের জীবনগাথাও আজ অনেক তরুণের কাছে অনুপ্রেরণার। হাওড়ার ডোমজুড়ের সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে তিনি দেশের অন্যতম সেরা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে কৃতিত্বের শিখরে পৌঁছেছেন। এমবিবিএস-এ স্বর্ণপদক অর্জন থেকে শুরু করে নিমহ্যানসে ডিএম নিউরোলজিতে অল ইন্ডিয়া র‍্যাঙ্ক ১ এবং গোল্ড মেডেল, প্রতিটি সাফল্য তাঁর অধ্যবসায় ও মেধার সাক্ষ্য বহন করে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তিনি ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। কিন্তু সাফল্যের এই উচ্চতায় পৌঁছেও তিনি নিজের শিকড়কে ভোলেননি।
 
একটি অনুষ্ঠানে ডাঃ এম এম শামীম
 
ব্যস্ত পেশাগত জীবন, গবেষণা ও চিকিৎসা পরিষেবার চাপের মধ্যেও তিনি বারবার ফিরে আসছেন গ্রামের মানুষের কাছে। তাঁর বিশ্বাস, উন্নত চিকিৎসা শুধু শহরের মানুষের একচেটিয়া অধিকার হতে পারে না। সমাজের প্রান্তিক ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের কাছেও আধুনিক চিকিৎসার আলো পৌঁছে দিতে হবে।
 
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, শুধুমাত্র চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়াতেই তাঁরা থেমে নেই। গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রাথমিক স্তরের চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। হাতুড়ে চিকিৎসার প্রবণতা কমিয়ে বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক চিকিৎসার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানোর লক্ষ্যেও কাজ করছেন তাঁরা।
 
ডাঃ এম এম শামীম একটি পুরস্কার গ্রহণের মুহূর্তে
 
মানবসেবার এই উদ্যোগকে অনেকেই নতুন দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন। কারণ বর্তমান সময়ে যখন চিকিৎসা ক্ষেত্রকে ঘিরে নানা বিতর্ক ও অভিযোগ সামনে আসে, তখন ডাঃ শামীম এবং তাঁর সহকর্মীদের এই নিঃস্বার্থ প্রয়াস চিকিৎসক সমাজের মানবিক মুখটিকেই আরও একবার সামনে নিয়ে এল।
 
সাফল্যের শিখরে থেকেও নিজের মাটির মানুষের কথা ভুলে না যাওয়ার এই দৃষ্টান্ত নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণাদায়ক।  ডোমজুড়ের সেই গ্রামের মানুষদের চোখে তাই ডাঃ এম এম শামীম শুধু একজন খ্যাতনামা নিউরোলজিস্ট নন, তিনি তাঁদের আপনজন, একজন মানবিক চিকিৎসক, যিনি চিকিৎসাকে পেশা নয়, সেবার ব্রত হিসেবেই দেখেন।