নিকুঞ্জ নাথ / গুয়াহাটি
বর্তমান সময়ে সংবাদমাধ্যমের পাতায় প্রায়ই উঠে আসে ধর্মীয় মেরুকরণ, সামাজিক বিভাজন এবং পারস্পরিক বিদ্বেষের নানা খবর। এমন এক প্রেক্ষাপটে অসমের বঙাইগাঁও জেলা থেকে সামনে এসেছে মানবতা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ধর্মীয় সংকীর্ণতার গণ্ডি ভেঙে একটি মুসলিম-অধ্যুষিত গ্রামের মানুষ হিন্দু রীতি-নীতি ও পরম্পরা মেনে এক হিন্দু যুবকের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক ঐক্যের এক উজ্জ্বল বার্তা তুলে ধরেছেন। হৃদয়স্পর্শী এই ঘটনাটি প্রমাণ করেছে, মানবতার বন্ধন সব ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে।
এই ঘটনাটি ঘটেছে বঙাইগাঁও জেলার সৃজনগ্রাম বিধানসভা এলাকার অন্তর্গত আমবাড়ি-পারেরচর গ্রামে। উল্লেখ্য, গ্রামটি একটি মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকা। সম্প্রতি গ্রামের বাসিন্দা প্রতীক ভৌমিক নামে এক হিন্দু যুবকের অকাল মৃত্যু ঘটে। যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় গোটা এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। কিন্তু ধর্মীয় ভিন্নতা এই শোকাহত পরিবেশে কোনো প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। প্রতীক ভৌমিকের আকস্মিক মৃত্যুর পরই স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও দাহকার্যের সমস্ত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পূর্ণ সহযোগিতা করেন।
প্রয়াত প্রতীক ভৌমিকের বাড়িতে সমবেত গ্রামবাসী
গ্রামের মানুষ ধর্ম-বর্ণ ভুলে সমবেতভাবে মৃতদেহটি নিজেদের কাঁধে বহন করে নিয়ে যান। শুধু তাই নয়, হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরাকে পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে জনসাধারণের শ্মশানে যাতে শেষকৃত্যের সমগ্র প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, তাও তাঁরা নিশ্চিত করেন।
সম্প্রীতির এই মহৎ কাজে অংশ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা অমর আলি বলেন, “প্রতীক ভৌমিকের মৃত্যুর ঘটনায় আমরা আমবাড়িবাসী গভীর শোক প্রকাশ করছি এবং তাঁর পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি। আজ আমরা এর মাধ্যমে সমগ্র অসমবাসীকে এই বার্তা দিতে চাই যে হিন্দু-মুসলিম বলে কোনো ভেদাভেদ নেই। প্রয়াত ব্যক্তির জন্য আমাদের আমবাড়ির মানুষ হাতে-কলমে কাজ করে তাঁর সৎকার সম্পন্ন করতে এগিয়ে এসেছি। আমরা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি, প্রতীক ভৌমিক যেন স্বর্গবাসী হন।”
প্রতীক ভৌমিকের মৃতদেহ সৎকারের জন্য নিয়ে যাওয়ার একটি মুহূর্ত
একইভাবে আরেক স্থানীয় সচেতন নাগরিক আবুল কালাম আজাদ এলাকার সামাজিক বন্ধনের কথা স্মরণ করে বলেন, “প্রয়াত প্রতীক একটি হিন্দু পরিবারের সদস্য হলেও আমরা কখনও হিন্দু-মুসলিম মানসিকতা পোষণ করিনি। আমাদের আমবাড়ি টিলাপাড়া পাহাড়তলী এলাকায় এই পরিবারের সঙ্গে আমরা দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে বসবাস করছি। সব সমস্যায় আমরা একে অপরকে সহযোগিতা করেছি। নানা প্রতিকূলতার মোকাবিলা করে আমরা সবাই এগিয়ে গিয়েছি। এই পরিবারের কাজকর্ম আমবাড়িবাসীর মনে গভীর ছাপ রেখে গেছে। বিশেষ করে প্রয়াত প্রতীক ভৌমিকের কাজ আমরা সবসময় স্মরণে রাখব। তাঁকে অকালেই হারিয়ে আমরা অত্যন্ত মর্মাহত।”
বর্তমান সময়ে হিন্দু-মুসলিমকে কেন্দ্র করে কিছু কার্যকলাপের কারণে সামাজিক পরিবেশ দূষিত হয়ে উঠছে বলে কালাম গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এর কুপ্রভাব যাতে তাঁদের এলাকার শান্তি ও সম্প্রীতির ওপর কখনও না পড়ে, সে জন্য তিনি সকলকে সতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
ধর্মীয় সীমারেখাকে সম্পূর্ণভাবে অতিক্রম করে বিপদে-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই মহান উদ্যোগ ইতিমধ্যেই সমগ্র অঞ্চলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। বহু সচেতন মানুষ আমবাড়ি-পারেরচর গ্রামের এই পদক্ষেপকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যুগ যুগ ধরে চলে আসা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক অনন্য এবং উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যখন ধর্মীয় মেরুকরণ এবং সামাজিক বিভাজন নিয়ে নানা বিতর্ক ও উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে আমবাড়ি-পারেরচরের বাসিন্দারা যে পথ দেখিয়েছেন, তা প্রকৃত মানবতা, সামাজিক ঐক্য এবং সাম্প্রদায়িক সদিচ্ছার এক সত্যিকারের প্রতিফলন।
বঙাইগাঁওয়ের আমবাড়ি-পারেরচর গ্রামের এই ঘটনা সমাজকে আবারও সেই চিরন্তন সত্যের কথা মনে করিয়ে দিল যে, “মানবতার কোনো ধর্ম নেই, মানুষের প্রকৃত পরিচয় মানবতাই।” ধর্ম কেবল উপাসনার পদ্ধতি হতে পারে, কিন্তু তা কখনও মানুষের মধ্যে প্রাচীর সৃষ্টি করতে পারে না। এই গ্রামের মানুষ বুক ভরা ভ্রাতৃত্ববোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা শুধু অসম নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্যই এক বড় অনুপ্রেরণা।