স্বাধীনতা সংগ্রামী পারুল মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিবাহী তেঁতুল গাছ রক্ষায় জিতল মানুষের লড়াই
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
দক্ষিণ কলকাতার বাঘাযতীনের কাছে বিদ্যাসাগর কলোনির একটি প্রায় ৭০ বছরের পুরনো তেঁতুল গাছকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল এক বিরল গণআন্দোলন। এই গাছ শুধু একটি বৃক্ষ নয়, এটি স্বাধীনতা সংগ্রামী পারুল মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতি, স্থানীয় ইতিহাস এবং নগর জীববৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। অবশেষে দীর্ঘ আন্দোলন, হাজার হাজার মানুষের স্বাক্ষর এবং প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এই ঐতিহাসিক গাছটি রক্ষা করার আশ্বাস মিলেছে।
স্বাধীনতা সংগ্রামী পারুল মুখোপাধ্যায় ১৯৩৫ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে টিটাগড় ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়ে চার বছর কারাবাস করেন। দেশভাগের পর তিনি কলকাতার বিদ্যাসাগর কলোনিতে বসবাস শুরু করেন। প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি গভীর অনুরাগী পারুল দেবী নিজ হাতে এই তেঁতুল গাছটি রোপণ ও পরিচর্যা করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরও গাছটি এলাকার মানুষের কাছে তাঁর স্মৃতির জীবন্ত প্রতীক হয়ে রয়েছে।
বিদ্যাসাগর কলোনির প্রায় ৭০ বছরের পুরনো তেঁতুল গাছ
২০২৪ সালে পারুল মুখোপাধ্যায়ের বসতভিটার জমি একটি নির্মাণ সংস্থার হাতে চলে যাওয়ার পর এই গাছের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যেই ওই এলাকায় একটি আমগাছসহ একাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়েছিল। এরপরই স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশপ্রেমী এবং সংস্কৃতিকর্মীরা গাছটিকে রক্ষার আন্দোলনে শামিল হন।
চলচ্চিত্র নির্মাতা ও আলোকচিত্রী দেবলীনা মজুমদার, যিনি দীর্ঘ ১২ বছর ধরে এই গাছ এবং তার জীববৈচিত্র্য নথিভুক্ত করেছেন, আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর নির্মিত ৩০ মিনিটের তথ্যচিত্র "Friends of Jilipibala" ২০২৫ সালের কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং গাছ রক্ষার আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়।
"Friends of Jilipibala"-এর পোস্টার
দেবলীনা মজুমদার জানিয়েছেন, এই তেঁতুল গাছটি অসংখ্য পাখির আবাসস্থল। এখানে টিয়া, শালিক, মাছরাঙা, কাঠঠোকরা-সহ নানা প্রজাতির পাখির বসবাস রয়েছে। তাই গাছটি শুধু ঐতিহাসিকভাবেই নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গাছটিকে বাঁচানোর দাবিতে শুরু হয় স্বাক্ষর অভিযান। দেশ-বিদেশের পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ এই আবেদনে সমর্থন জানান। পাশাপাশি গাছের তলায় আয়োজিত হয় গান, গল্প, পাখি দেখা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই আন্দোলনে অংশ নেন অধ্যাপিকা সমতা বিশ্বাস, চলচ্চিত্র নির্মাতা শুভম রায়চৌধুরী, শিক্ষিকা বর্ণালী দাস, মধুচ্ছন্দা ভট্টাচার্যসহ বহু মানুষ।
আর্কো মুখার্জির কনসার্টের একটি দৃশ্য
অবশেষে আন্দোলনের জয় হয়েছে। দেবলীনা মজুমদার সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, "We Did It!" অর্থাৎ "আমরা পেরেছি"। তিনি জানান, কলকাতা পুরসভা এবং বনদপ্তর একমত হয়েছে যে এই ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত গুরুত্বসম্পন্ন গাছটি সংরক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি সেখানে স্বাধীনতা সংগ্রামী পারুল মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে একটি স্মারকও গড়ে তোলা হবে।
আজ বিদ্যাসাগর কলোনির সেই তেঁতুল গাছ কেবল একটি গাছ নয়, এটি মানুষের ঐক্য, ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রকৃতি রক্ষার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় মানুষের আশা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা, পরিবেশ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা লাভ করবে।