জলের ভিতর পাঁচ বছরের জীবন, মানবিকতার হাত বাড়ালেন অনন্ত আম্বানি

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 5 h ago
জলের ভিতর পাঁচ বছরের জীবন, মানবিকতার হাত বাড়ালেন অনন্ত আম্বানি
জলের ভিতর পাঁচ বছরের জীবন, মানবিকতার হাত বাড়ালেন অনন্ত আম্বানি
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী

পাঁচ বছর ধরে সূর্যের আলোই যেন আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছিল মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার কিশোর ইকবালের কাছে। সকাল হলেই শুরু হতো অসহ্য যন্ত্রণা। রোদের সংস্পর্শে শরীরে দেখা দিত তীব্র জ্বালা। সেই যন্ত্রণা থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে দিনের বড় একটা সময় তাকে গলা পর্যন্ত জলে ডুবে থাকতে হতো। সন্ধ্যা নামলে পুকুর থেকে উঠে বাড়ি ফিরত সে। পরদিন আবার সূর্যের আলো দেখা দিলেই শুরু হতো একই জীবনযন্ত্রণা।এভাবেই কেটে গিয়েছে তার জীবনের প্রায় পাঁচটি বছর। যে বয়সে অন্য শিশুরা স্কুল, বন্ধু, খেলাধুলা আর স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেই বয়সে ইকবালের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল একটি পুকুর। জলের মধ্যে ডুবে থাকাই হয়ে উঠেছিল তার বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন।
 
মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার এই কিশোরের অসহায় জীবনের কথা গত ১৪ আগস্ট সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসে। একটি পোস্টের মাধ্যমে সামনে আসে তার দুর্বিষহ জীবনযাপনের ছবি। সেই পোস্ট ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বহু মানুষের নজরে আসে ইকবালের অসুস্থতার কথা। জানা যায়, বিরল ও জটিল এই রোগের চিকিৎসা করানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই তার পরিবারের। ফলে চিকিৎসার সুযোগ না পেয়ে বছরের পর বছর ধরে যন্ত্রণার সঙ্গেই দিন কাটাতে হচ্ছিল তাকে।
 
পরিবারের কাছে প্রতিটি দিন ছিল অসহায়তার। সন্তানের কষ্ট চোখের সামনে দেখেও কার্যত কিছুই করার ছিল না বাবা-মায়ের। চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও অর্থের অভাবে সেই চিকিৎসার দরজা তাঁদের কাছে ছিল অধরা। একসময় পুকুরের জলই হয়ে ওঠে ইকবালের সাময়িক স্বস্তির একমাত্র আশ্রয়।
 
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত সেই খবরই শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানির কাছে। এরপরই বদলে যেতে শুরু করে পরিস্থিতি। ইকবালের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার উদ্যোগ করেন অনন্ত আম্বানি। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে মুম্বইয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। জানা গিয়েছে, বিশেষ চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ইকবালকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
 
একটি পরিবারের কাছে এই উদ্যোগ নিছক আর্থিক সহায়তা নয়। দীর্ঘ পাঁচ বছরের অসহায়তার পর এটি যেন নতুন করে আশার দরজা খুলে দেওয়ার মতো। যে কিশোর এতদিন সূর্যের আলোকে ভয় পেয়ে জলের মধ্যে আশ্রয় নিত, তার সামনে এবার উন্নত চিকিৎসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইকবালের বাবা-মায়ের কাছে এই মুহূর্তটি তাই অত্যন্ত আবেগের। সন্তানের যন্ত্রণা তাঁরা প্রতিদিন দেখেছেন। রোদ উঠলেই যে সন্তানকে জলের মধ্যে গিয়ে থাকতে হতো, তার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অপেক্ষায় তাঁরা দিনের পর দিন কাটিয়েছেন। চিকিৎসার সুযোগ পাওয়ার পর এবার তাঁদের আশা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার মাধ্যমে ইকবালের শারীরিক কষ্ট অনেকটাই কমবে এবং সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে।
 
বেলডাঙার মানুষের কাছেও ঘটনাটি তাই অন্যরকম বার্তা বহন করছে। নানা সময়ে নানা কারণে বেলডাঙা সংবাদ শিরোনামে এসেছে। কিন্তু এবার এক অসুস্থ কিশোরের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনা এলাকার মানুষের কাছে মানবিকতার এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।এই ঘটনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা। একটি পোস্ট থেকে শুরু হওয়া বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে। সেই সূত্রেই অসহায় পরিবারের কথা পৌঁছে যায় এমন একজনের কাছে, যিনি চিকিৎসার ব্যবস্থা করার মতো সামর্থ্য রাখেন। ফলে সামাজিক মাধ্যম যে কখনও কখনও মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা বৃহত্তর সমাজের সামনে তুলে ধরে বাস্তব পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে, ইকবালের ঘটনা তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
 
পাঁচ বছর ধরে জল ছিল ইকবালের কাছে যন্ত্রণার মধ্যে বেঁচে থাকার আশ্রয়। সেই জলের জীবন থেকে এবার চিকিৎসার জগতে পা রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে তার। সামনে এখনও দীর্ঘ চিকিৎসা এবং নানা অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে এতদিনের অন্ধকারের মধ্যে অন্তত আশার একটি আলো দেখা দিয়েছে।
 
ইকবালের পরিবারের পাশাপাশি প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও এখন তার সুস্থতার অপেক্ষায়। তাঁদের আশা, উন্নত চিকিৎসার সুযোগ কাজে লাগবে এবং একদিন ইকবাল আর পুকুরের জলে গলা ডুবিয়ে দিন কাটাতে বাধ্য হবে না। সূর্যের আলো আর আতঙ্কের কারণ হয়ে থাকবে না; বরং সেই আলোতেই সে ফিরে পাবে স্বাভাবিক জীবনের স্বাদ।
 
একটি সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট থেকে শুরু হয়ে একটি অসহায় পরিবারের জীবনে যে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে মানবিকতার এক আশাব্যঞ্জক গল্প। অনন্ত আম্বানির এই উদ্যোগ শুধু একজন কিশোরের চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করেনি, একই সঙ্গে সমাজের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও তুলে ধরেছে—মানুষের বিপদের সময় অন্য একজন মানুষ পাশে দাঁড়ালে অনেক অসম্ভবকেও সম্ভব করার পথ তৈরি হয়।
 
বেলডাঙার ইকবালের জীবনে তাই এখন অপেক্ষা এক নতুন অধ্যায়ের। পাঁচ বছরের জলবন্দি জীবন পেরিয়ে সে কবে সুস্থ শরীরে, স্বাভাবিকভাবে সূর্যের আলোয় দাঁড়াতে পারবে—সেই প্রতীক্ষাতেই পরিবার, প্রতিবেশী এবং অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী। যন্ত্রণায় ডুবে থাকা একটি জীবনকে জলের বাইরে এনে স্বাভাবিক জীবনের আলোয় ফেরানোর এই প্রচেষ্টা তাই শুধু চিকিৎসা-সহায়তার ঘটনা নয়; এটি মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।