প্রান্তিক বাংলার মাটি থেকে রাষ্ট্রপতির মঞ্চে: কল্লোল ভট্টাচার্যের ‘তেপান্তর’-এর নাট্যজয়

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
প্রান্তিক বাংলার মাটি থেকে রাষ্ট্রপতির মঞ্চে: কল্লোল ভট্টাচার্যের ‘তেপান্তর’-এর নাট্যজয়
প্রান্তিক বাংলার মাটি থেকে রাষ্ট্রপতির মঞ্চে: কল্লোল ভট্টাচার্যের ‘তেপান্তর’-এর নাট্যজয়
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

বাংলা নাটকের ইতিহাসে শহর ও মফস্‌সলের দূরত্ব নতুন কোনও কথা নয়। দীর্ঘদিন ধরে নাট্যচর্চার বড় পরিসর বলতে কলকাতার মঞ্চ, পরিচিত নাট্যদল এবং শহুরে সাংস্কৃতিক পরিসরকেই বোঝানো হয়েছে। কিন্তু পশ্চিম বর্ধমানের কাঁকসার প্রত্যন্ত সাতকাহনিয়া গ্রাম সেই প্রচলিত ধারণাকেই যেন অন্যভাবে প্রশ্ন করেছে।
 
১৯৯৪ সালে সেই গ্রামেই কল্লোল ভট্টাচার্যের হাত ধরে তৈরি হয় ‘তেপান্তর’, একটি নাট্যগ্রাম। নাট্যদলের নাম ‘এবং আমরা’। আজ সেই তেপান্তরের স্রষ্টার হাতে দেশের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছ থেকে উঠে এসেছে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার। দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে বৃহস্পতিবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই সম্মান গ্রহণ করেছেন কল্লোল ভট্টাচার্য।
 
দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে বৃহস্পতিবার আয়োজিত অনুষ্ঠানের একটি মুহূর্ত
 
এই মুহূর্তটিকে শুধু একজন নাট্যব্যক্তিত্বের ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখলে গল্পটির আসল গুরুত্ব হয়তো ধরা পড়বে না। কারণ কল্লোলের পথচলার বিশেষত্ব পুরস্কারের মঞ্চে নয়, তার অনেক আগের সেই মাটিতে, যেখানে তিনি নাটক করার জন্য খুঁজে নিয়েছিলেন গ্রামের দিনমজুর ছেলেদের।
 
নাটক করবেন দিনমজুরেরা? শুরুর সময় এমন প্রশ্নই উঠেছিল। কটূক্তিও শুনতে হয়েছিল। কিন্তু কল্লোল থামেননি। যাঁদের হাতে প্রতিদিনের শ্রম, মাটির গন্ধ এবং জীবিকার কঠিন বাস্তবতা ছিল, তাঁদের নিয়েই শুরু করেছিলেন নাটকের অনুশীলন।
 
আজ সেই দিনমজুরদের অনেকেই দক্ষ নাট্যকর্মী। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁরা নাটক করতে যান। আর যে তেপান্তর একসময় একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট্ট নাট্যচর্চার জায়গা ছিল, সেটিই এখন অন্য নাট্যদলের শিল্পীদের আকর্ষণের কেন্দ্র। এই পরিবর্তনই কল্লোল ভট্টাচার্যের নাট্যভাবনার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
 
তাঁর নাট্যচর্চা যেন বলেছে, নাটক করার অধিকার কোনও নির্দিষ্ট শ্রেণি, শহর বা পেশার মানুষের একার নয়। মঞ্চ তৈরি হতে পারে গ্রামের মাটিতেও। একজন দিনমজুরও অভিনেতা হতে পারেন। প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণ-তরুণীরাও জাতীয় নাট্যপরিসরে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে পারেন।
 
দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে বৃহস্পতিবার আয়োজিত অনুষ্ঠানের একটি মুহূর্ত
 
তেপান্তরের গল্প এখানেই থেমে থাকেনি। একসময় মহিলা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য মহিলা নাট্যকর্মী পাওয়াও কঠিন ছিল। আজ সেই পরিস্থিতি বদলেছে। শুধু সাতকাহনিয়া নয়, আশপাশের গ্রাম এবং অন্যান্য জেলা থেকেও ছেলেমেয়েরা তেপান্তরে এসে নাটকের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। অর্থাৎ একটি গ্রামের নাট্যচর্চা ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক শিক্ষাকেন্দ্রের রূপ নিয়েছে।
 
তেপান্তরের কাজ দেশের বাইরেও নজর কেড়েছে। বিদেশের বিভিন্ন নাট্যদল এখানে নাট্যচর্চার জন্য এসেছে। প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব রতন থিয়ামও একাধিকবার তেপান্তরে এসে এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। আর এবার রাষ্ট্রপতির হাত থেকে জাতীয় সম্মান।
 
১৯৫২ সাল থেকে দেশের সঙ্গীত, নৃত্য ও নাট্যক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। কলকাতার বহু বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব এই সম্মান পেয়েছেন। সেই তালিকায় এবার প্রান্তিক বাংলার কাঁকসার নাম আরও জোরালোভাবে উঠে এল কল্লোল ভট্টাচার্যের মাধ্যমে। এই স্বীকৃতি আসলে একটি নতুন সময়ের ইঙ্গিতও বহন করছে।
 
দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে বৃহস্পতিবার আয়োজিত অনুষ্ঠানের একটি মুহূর্ত
 
বাংলার নাট্যচর্চা যে শুধু কলকাতাকেন্দ্রিক নয়, তার প্রমাণ বহুদিন ধরেই বিভিন্ন জেলা দিয়ে আসছে। কিন্তু কল্লোলের তেপান্তর সেই ধারাকে আরও অন্য জায়গায় নিয়ে গেছে। এখানে নাটক শুধু মঞ্চে অভিনীত একটি শিল্প নয়; এটি গ্রামীণ মানুষের আত্মপ্রকাশের মাধ্যম, প্রশিক্ষণের জায়গা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও একটি হাতিয়ার।
 
তাই রাষ্ট্রপতির হাত থেকে কল্লোল ভট্টাচার্যের পুরস্কার গ্রহণের ছবিটি আসলে এক ব্যক্তির ছবি নয়। তার পেছনে রয়েছে সাতকাহনিয়ার সেই মাটি, দিনমজুর অভিনেতাদের ঘাম, গ্রামের তরুণদের স্বপ্ন এবং ১৯৯৪ সালে শুরু হওয়া এক অসম্ভবকে সম্ভব করার জেদ।
 
যে মানুষটিকে একদিন শুনতে হয়েছিল, দিনমজুর দিয়ে নাটক হয় না, তিনিই আজ জাতীয় নাট্যসম্মানের মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছেন, নাটকের শক্তি শহরের ঠিকানায় নয়, মানুষের সৃজনশীলতায়।
 

বাংলা নাটকের সামনে তাই কল্লোল ভট্টাচার্যের এই সম্মান শুধু অতীতের সাফল্যের স্বীকৃতি নয়। এটি আগামী দিনের জন্য একটি বার্তা, প্রান্তিক বাংলার মাটিতেও বড় নাট্যস্বপ্ন জন্ম নিতে পারে। আর সেই স্বপ্ন যদি নিষ্ঠা, প্রশিক্ষণ এবং মানুষের অংশগ্রহণে বেড়ে ওঠে, একদিন তার আলো পৌঁছে যেতে পারে দেশের সর্বোচ্চ সাংস্কৃতিক মঞ্চেও।
 
‘তেপান্তর’ নামটি যেন সেই কারণেই আজ আরও তাৎপর্যপূর্ণ। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার যে কল্পিত সীমারেখা, কল্লোল ভট্টাচার্যের নাট্যযাত্রা যেন সেই সীমারেখাটিই মুছে দিচ্ছে। রাষ্ট্রপতির হাতের পুরস্কার তাই শেষ অধ্যায় নয়, প্রান্তিক বাংলার নাট্যমঞ্চে শুরু হওয়া এক নতুন সময়ের স্বীকৃতি।