দেবকিশোর চক্রবর্তী
ইতিহাসের পাতায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার নাম উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পলাশীর যুদ্ধ, মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা এবং মুর্শিদাবাদের হারিয়ে যাওয়া গৌরব। সেই ইতিহাসের সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে জড়িয়ে পড়েছে আরও একটি নাম—সমর্পিতা দত্ত। মুর্শিদাবাদের মানুষের কাছে যিনি এখন অনেকটাই পরিচিত ‘সমর্পিতা সিরাজ’ নামে।
সিরাজউদ্দৌলার স্মৃতি, তাঁর সমাধি এবং মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক স্থানগুলিকে ঘিরে দীর্ঘদিনের কাজের সূত্রেই সম্প্রতি তাঁকে ‘বেগম’ উপাধিতে সম্মানিত করা হয়েছে—এমন দাবি ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিওতে ‘বেগম উপাধি পেলেন সমর্পিতা দত্ত’ কিংবা ‘বেগম উপাধি পেয়ে কী বললেন সমর্পিতা সিরাজ’—এই ধরনের শিরোনামও সামনে এসেছে।
তবে এই উপাধি কে বা কোন সংগঠন দিয়েছে, কোথায় অনুষ্ঠান হয়েছে এবং এর কোনও প্রাতিষ্ঠানিক বা সরকারি স্বীকৃতি রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনও নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি বা মূলধারার সংবাদমাধ্যমের স্পষ্ট প্রতিবেদন সামনে আসেনি। ফলে ‘বেগম’কে সরকারি কিংবা ঐতিহাসিক রাজকীয় উপাধি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বিষয়টিকে সম্মানসূচক বা সামাজিক পরিচয়ের পরিসরেই দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত।
সমর্পিতা দত্তের কর্মজীবনের শুরু অভিনয়ের সঙ্গে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর জীবনের বড় অংশ জুড়ে যায় মুর্শিদাবাদ এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার স্মৃতি। প্রকাশিত বিভিন্ন লেখায় দাবি করা হয়েছে, কলকাতা ছেড়ে তিনি মুর্শিদাবাদের খোশবাগে এসে সিরাজউদ্দৌলার সমাধির পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। সমাধিস্থলের আশপাশে তাঁর দীর্ঘ উপস্থিতি এবং সিরাজের স্মৃতি রক্ষায় তাঁর আগ্রহ তাঁকে স্থানীয় মানুষের কাছে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।‘বেগম’ নামটিও তাই একেবারে সাম্প্রতিক নয়। ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি লেখায় উল্লেখ ছিল, স্থানীয় মানুষ তাঁকে ভালোবেসে ‘বেগম’ বলে ডাকেন। অর্থাৎ সামাজিক পরিচয় হিসেবে এই নামের ব্যবহার বেশ কিছু বছর ধরেই রয়েছে। সাম্প্রতিক ‘বেগম উপাধি’ প্রসঙ্গটি সম্ভবত সেই পুরনো সামাজিক পরিচয়কেই আরও আনুষ্ঠানিক সম্মানের রূপ দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সমর্পিতা দত্ত
মুর্শিদাবাদের খোশবাগ শুধু একটি সমাধিস্থল নয়; বাংলার ইতিহাসের এক বেদনাময় অধ্যায়ের স্মারকও। এখানেই সমাধিস্থ রয়েছেন সিরাজউদ্দৌলা। সমর্পিতার সঙ্গে এই স্থানটির দীর্ঘ সম্পর্কই তাঁর পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, তিনি সিরাজের সমাধির পরিচর্যা করেছেন, সেখানে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন এবং নবাবের ইতিহাস নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেছেন।তাঁর উদ্যোগের সঙ্গে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা মুক্ত বিদ্যালয়, খোশবাগ’-এর নামও জড়িয়ে রয়েছে। প্রকাশিত লেখাগুলিতে দাবি করা হয়েছে, স্থানীয় শিশুদের শিক্ষা ও ব্যক্তিত্বের বিকাশের বিষয়েও এই উদ্যোগে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
‘বেগম’ শব্দটির ঐতিহাসিক অর্থের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মুসলিম রাজপরিবারের নারী, বিশেষত নবাব বা অভিজাত পরিবারের নারীর পরিচয়। কিন্তু সমর্পিতার ক্ষেত্রে শব্দটির ব্যবহারকে সেই ঐতিহাসিক অর্থে দেখার কারণ নেই। বরং সিরাজের স্মৃতির প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের নিবেদন, খোশবাগে তাঁর উপস্থিতি এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সূত্রেই ‘বেগম’ নামটি সম্মানসূচক পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে ধারণা করা যায়।অতএব এই ‘বেগম’ পরিচয়কে সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে কোনও ঐতিহাসিক বৈবাহিক সম্পর্কের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
সমর্পিতাকে ঘিরে আরও একটি কৌতূহলোদ্দীপক দাবি সামাজিক মাধ্যমে ঘোরাফেরা করে। তিনি নাকি সিরাজউদ্দৌলার প্রিয়তমা লুৎফুন্নিসার পুনর্জন্ম। বিভিন্ন ইউটিউব ভিডিও, ব্লগ এবং সামাজিক-মাধ্যমের আলোচনায় এই ধারণার উল্লেখ রয়েছে। কোথাও কোথাও সমর্পিতাকে আধুনিক লুৎফুন্নিসা হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে।
সমর্পিতা দত্ত
কিন্তু এই দাবির পক্ষে কোনও ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ফলে এটিকে ইতিহাসের তথ্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। এটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস, অনুভূতি কিংবা লোকবিশ্বাসের পরিসরের বিষয়।সিরাজউদ্দৌলা ও লুৎফুন্নিসার সম্পর্ক নিয়েও ইতিহাসে নানা জনপ্রিয় বর্ণনা প্রচলিত। সেগুলির সবকটিই যে সমানভাবে প্রামাণ্য, এমন নয়। ফলে সমর্পিতাকে লুৎফুন্নিসার পুনর্জন্ম হিসেবে দেখার দাবির ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন।
সিরাজউদ্দৌলার প্রচলিত ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন তোলাও সমর্পিতার কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সাম্প্রতিক সামাজিক-মাধ্যমের বিভিন্ন ভিডিওতে তাঁকে ‘গবেষক সমর্পিতা সিরাজ’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে সিরাজের চরিত্র, ঘসেটি বেগম, রানি ভবানী এবং পলাশীর যুদ্ধের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
তবে ইতিহাসের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। কোনও ব্যক্তির গবেষণা, বক্তব্য বা বিকল্প ব্যাখ্যা থাকা এক বিষয়; আর সেই ব্যাখ্যা ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। কোনও দাবি গ্রহণ করার আগে প্রাথমিক ঐতিহাসিক দলিল, সমসাময়িক নথি এবং স্বীকৃত ইতিহাসবিদদের গবেষণার সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা জরুরি।
সমর্পিতাকে ‘বেগম’ উপাধিতে সম্মান জানানোর ঘটনাটি যদি কোনও সাংস্কৃতিক সংগঠন, স্থানীয় মানুষ বা নির্দিষ্ট কোনও গোষ্ঠীর উদ্যোগ হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে সিরাজের স্মৃতি রক্ষায় তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকার প্রতি সম্মান হিসেবেই দেখা যেতে পারে।কিন্তু এই উপাধি তাঁকে সিরাজউদ্দৌলার ঐতিহাসিক স্ত্রী প্রমাণ করে না। একইভাবে, এটি লুৎফুন্নিসার পুনর্জন্মের দাবিকেও প্রতিষ্ঠিত করে না।বরং এই ঘটনার তাৎপর্য অন্যত্র। ইতিহাসের এক বিতর্কিত ও আবেগঘন অধ্যায়কে ঘিরে একজন আধুনিক নারীর দীর্ঘদিনের উপস্থিতি কীভাবে স্থানীয় মানুষের মনে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে পারে, সমর্পিতা সিরাজের কাহিনি তারই একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ।সমর্পিতা সিরাজের গল্প তাই নিছক একটি উপাধি পাওয়ার গল্প নয়। এর মধ্যে রয়েছে ইতিহাস, স্মৃতি, ব্যক্তিগত বিশ্বাস, আবেগ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক জটিল মেলবন্ধন।
খোশবাগে সিরাজউদ্দৌলার সমাধির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক এবং নবাবের স্মৃতি রক্ষার কাজে তাঁর যুক্ত থাকার কথা পুরনো প্রকাশিত লেখাতেও উঠে এসেছে। আর ২০২৬ সালের আগস্টে সামাজিক মাধ্যমে ‘বেগম উপাধি’ পাওয়ার যে খবর ছড়িয়েছে, তা সেই দীর্ঘদিনের পরিচয়কেই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।
তবে উপাধিটির আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে। কে উপাধি দিলেন, কোন অনুষ্ঠানে দিলেন, তার কোনও লিখিত নথি রয়েছে কি না এবং সমর্পিতার মূল বক্তব্য কী—এসব তথ্য প্রকাশ্যে এলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
তাই আপাতত সবচেয়ে নির্ভুলভাবে বলা যায়, সমর্পিতা সিরাজকে ‘বেগম’ উপাধিতে সম্মানিত করার খবর সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলেও, উপাধিটির প্রদানকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য এখনও সীমিত।ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি তথ্য ও বিশ্বাসের মধ্যে সীমারেখা বজায় রাখা। সমর্পিতার যাত্রা যতই আকর্ষণীয় হোক, ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে ইতিহাসের প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করাই হবে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার প্রথম শর্ত।