শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার হায়দারপুর এলাকার কিশোরী শিল্পী রাফা ইয়াসমিন আজ শুধু একজন প্রতিভাবান গায়িকা নন, তিনি নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণার প্রতীক। সুরের জগতে নিজের অসাধারণ প্রতিভা দিয়ে বহু আগেই তিনি বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় স্তরে পরিচিতি পেয়েছেন। এবার সেই সাফল্যের মুকুটে যুক্ত হল আরও এক গর্বের পালক, মালদা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে ঘোষণা করা হয়েছে সাইবার সেফটি অ্যাম্বাসেডর হিসেবে।
মাত্র অল্প বয়সেই রাফা প্রমাণ করেছেন, প্রতিভা, অধ্যবসায় এবং দায়িত্ববোধ একসঙ্গে থাকলে সাফল্যের পথ অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। ২০০৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করা রাফার সঙ্গীতের সঙ্গে সম্পর্ক শুরু হয় খুব ছোটবেলাতেই। মাত্র আড়াই বছর বয়স থেকে তাঁর সংগীত শিক্ষার সূচনা। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুলগীতির প্রাথমিক তালিম তিনি মালদাতেই গ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন।
রাফার জাতীয় স্তরে প্রথম বড় সাফল্য আসে অল ইন্ডিয়া ট্যালেন্ট সার্চ ও মেরিট টেস্ট প্রতিযোগিতায়, যেখানে একাধিক বিভাগে তিনি স্বর্ণপদক অর্জন করেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত মঞ্চে তাঁর পুরস্কার গ্রহণ ও সংগীত পরিবেশন ছিল তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
২০১৯ সালে জনপ্রিয় বাংলা টেলিভিশন রিয়েলিটি শো সুপার সিঙ্গার জুনিয়র-এ অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাফা ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে ওঠেন। সেখানে তাঁর সুরেলা কণ্ঠ ও আত্মবিশ্বাসী পরিবেশনা দর্শকদের মন জয় করে। এরপর ২০২০ সালে স্টার প্লাসের জাতীয় মঞ্চ তারে জমিন পর-এ অংশ নিয়ে তিনি সারা দেশের নজর কেড়ে নেন। শঙ্কর মহাদেবন, জনিতা গান্ধীর মতো বিশিষ্ট শিল্পীদের উপস্থিতিতে তাঁর পারফরম্যান্স তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
তবে রাফার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় মোড় আসে ২০২২ সালে সা রে গা মা পা লিটল চ্যাম্পস-এ অংশগ্রহণের মাধ্যমে। মুম্বইয়ের এই বিশাল মঞ্চে তাঁর অনন্য কণ্ঠ, শাস্ত্রীয় সুরের ভিত, আধুনিক উপস্থাপনা এবং মঞ্চ দখলের ক্ষমতা বিচারক থেকে দর্শক, সবাইকে মুগ্ধ করে। কিংবদন্তি কুমার শানু, জিৎ গাঙ্গগুলির মতো তারকারা তাঁর প্রতিভার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। পুরস্কার হিসেবে গিটার প্রাপ্তি ছিল তাঁর সঙ্গীত জীবনের এক স্মরণীয় স্বীকৃতি। প্রতিযোগিতায় পঞ্চম রানার আপ বা ষষ্ঠ স্থান অর্জন করলেও মানুষের হৃদয়ে তিনি জয় করে নেন অনেক বড় স্থান।
মুম্বই থেকে মালদায় ফেরার পর রাফাকে ঘিরে উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল চোখে পড়ার মতো। সাধারণ মানুষ থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সবাই তাঁকে সংবর্ধনা জানান। রাজ্যের মন্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন তাঁর বাড়িতে গিয়ে রাফাকে সম্মান জানিয়ে বলেন, একসময় গণিখান চৌধুরী যেমন মালদার নাম দেশজুড়ে পরিচিত করেছিলেন, আজ সেই কাজ নতুনভাবে করছে রাফা ইয়াসমিন তাঁর সুরের মাধ্যমে।
অরিজিৎ সিংয়ের সঙ্গে রাফা ইয়াসমিনের একটি ছবি
রাফার সাফল্য শুধু টেলিভিশনের মঞ্চেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয়, পপ, রক, লোকসংগীতসহ নানা ধারায় নিজেকে ক্রমাগত বিকশিত করেছেন। লাইভ কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নিজস্ব গান প্রকাশের মাধ্যমেও তিনি নিজের পরিচিতি আরও বিস্তৃত করেছেন। “মেলোডি কুইন”, “রকস্টার”, “এক্সপ্রেশন কুইন”, এমন নানা বিশেষণে তাঁকে ভূষিত করেছেন অনুরাগীরা।
এই দীর্ঘ সাফল্যের যাত্রাপথে ২০২৫ সালে তাঁর জীবনে আসে নতুন এক সামাজিক দায়িত্ব। মালদা জেলা পুলিশ তাঁকে সাইবার সেফটি অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিয়োগ করে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে যেখানে সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা ও সামাজিক মাধ্যমের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে, সেখানে তরুণ সমাজের কাছে রাফার মতো জনপ্রিয় মুখের এই ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর জনপ্রিয়তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সাইবার সচেতনতার বার্তা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই উদ্যোগের
মূল লক্ষ্য।
রাফা ইয়াসমিন
রাফা ইয়াসমিনের জীবনগাথা প্রমাণ করে, একজন শিল্পী শুধু বিনোদনের মাধ্যম নন, তিনি সমাজ পরিবর্তনেরও শক্তিশালী দূত হতে পারেন। সুরের মাধুর্যে যেমন তিনি লাখো মানুষের হৃদয় জয় করেছেন, তেমনই এখন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সমাজকে নিরাপদ ও সচেতন করার বার্তাও বহন করছেন। মালদার এই কিশোরী আজ সত্যিই জেলার গর্ব, বাংলার অহংকার এবং নতুন প্রজন্মের কাছে স্বপ্নপূরণের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর কণ্ঠে যেমন সুরের শক্তি, তেমনই তাঁর পথচলায় রয়েছে অধ্যবসায়, প্রতিভা ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার এক অনন্য সমন্বয়।