ক্যানসারকে হার না মানার গল্প: ১১ হাজার ফুট উচ্চতায় জীবনের জয়গান গাইলেন নাফিসা আলি

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
ক্যানসারকে হার না মানার গল্প: ১১ হাজার ফুট উচ্চতায় জীবনের জয়গান গাইলেন নাফিসা আলি
ক্যানসারকে হার না মানার গল্প: ১১ হাজার ফুট উচ্চতায় জীবনের জয়গান গাইলেন নাফিসা আলি
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

জীবন কখনও কখনও এমন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেখানে অনেকেই ভেঙে পড়েন। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা প্রতিকূলতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠেন। প্রবীণ অভিনেত্রী নাফিসা আলি সেই বিরল মানুষদেরই একজন।
 
পেরিটোনিয়াল ও ওভারিয়ান ক্যানসারের পুনরাবৃত্তির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছেন তিনি। অস্ত্রোপচার, একের পর এক কেমোথেরাপি এবং শারীরিক দুর্বলতার মতো কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়েও তিনি জীবনের প্রতি আস্থা হারাননি। বরং প্রমাণ করেছেন, মানুষের ইচ্ছাশক্তি অনেক সময় শারীরিক সীমাবদ্ধতাকেও অতিক্রম করতে পারে।
 
প্রবীণ অভিনেত্রী নাফিসা আলি
 
সম্প্রতি নাফিসা আলি হিমাচল প্রদেশের মনোরম পাহাড়ি অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১ হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। Rohtang Pass-এর কাছাকাছি এই সফর ছিল শুধু একটি পাহাড়ি ভ্রমণ নয়; এটি ছিল সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং জীবনকে নতুন করে আবিষ্কারের এক অসাধারণ যাত্রা।
 
পাহাড়ি দুর্গম পথে চলার সময় পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা নিতে হয়েছে তাঁকে। বিশেষ করে জামাই ও নাতির সহায়তায় তিনি এগিয়ে গিয়েছেন প্রতিটি পদক্ষেপে। কিন্তু সেই সাহায্যের আড়ালে ছিল তাঁর অদম্য মানসিক শক্তি। শারীরিক ক্লান্তি কিংবা অসুস্থতা তাঁর মুখের হাসি মুছে দিতে পারেনি। বরং প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝে তিনি যেন খুঁজে পেয়েছেন নতুন করে বেঁচে থাকার আনন্দ।
 
নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে গিয়ে নাফিসা বলেছেন, অস্ত্রোপচার এবং অসংখ্য কেমোথেরাপির পর এই পাহাড়ি সফর তাঁকে যেন নতুন জীবনের স্বাদ দিয়েছে। অটল টানেল পেরিয়ে সিসু অঞ্চলে পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময় তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে এক অমূল্য স্মৃতি। প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটানো সেই মুহূর্তগুলো তাঁকে মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।
 
নাফিসা আলি তাঁর স্বামীর সঙ্গে 
 
তাঁর এই যাত্রার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ২০১৮ সালে তাঁর শরীরে প্রথম ধরা পড়ে পেরিটোনিয়াল ও ওভারিয়ান ক্যানসার। দীর্ঘ চিকিৎসা ও কঠোর লড়াইয়ের পর তিনি সুস্থতার পথে ফিরেছিলেন। কিন্তু পরে আবার ফিরে আসে সেই মারণরোগ। অনেকেই হয়তো এমন পরিস্থিতিতে আশাভঙ্গ হয়ে পড়তেন। কিন্তু নাফিসা আলি ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি অসুস্থতাকে জীবনের শেষ অধ্যায় হিসেবে নয়, বরং নতুন করে লড়াই শুরু করার একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
 
এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, প্রথম দিকে চিকিৎসকেরা তাঁর সমস্যার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করতে পারেননি। কিন্তু তিনি নিজের শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং বারবার চিকিৎসকদের কাছে নিজের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর সচেতনতা, ধৈর্য এবং দৃঢ় মনোভাবই শেষ পর্যন্ত সঠিক রোগ নির্ণয়ে সহায়ক হয়। এই অভিজ্ঞতা আমাদের সকলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে, নিজের শরীরের পরিবর্তনকে অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসা পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
 
আজও ক্যানসারের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই চলমান। কিন্তু সেই লড়াইয়ের মাঝেও তিনি প্রমাণ করেছেন, জীবন শুধুমাত্র রোগের নাম নয়; জীবন মানে আশা, সাহস, ভালোবাসা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা। ১১ হাজার ফুট উচ্চতায় দাঁড়িয়ে তিনি যেন সবার উদ্দেশে একটাই বার্তা দিয়েছেন, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, মনোবল অটুট থাকলে কোনও বাধাই অজেয় নয়।
 
 
নাফিসা আলির এই সংগ্রাম শুধু একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত কাহিনি নয়; এটি হাজারো ক্যানসারযোদ্ধা এবং তাঁদের পরিবারের জন্য আশার আলো। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, শরীর কখনও দুর্বল হতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন, সাহস এবং ইচ্ছাশক্তি যদি জীবন্ত থাকে, তবে জীবনের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ও জয় করা সম্ভব।