মাটি, নদী আর মানুষের লড়াই, সুন্দরবনকে বাঁচাতে একাই শুরু, আজ হাজার মানুষের ভরসা উমাশঙ্কর মণ্ডল

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 14 h ago
মাটি, নদী আর মানুষের লড়াই, সুন্দরবনকে বাঁচাতে একাই শুরু, আজ হাজার মানুষের ভরসা উমাশঙ্কর মণ্ডল
মাটি, নদী আর মানুষের লড়াই, সুন্দরবনকে বাঁচাতে একাই শুরু, আজ হাজার মানুষের ভরসা উমাশঙ্কর মণ্ডল

শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

সকালের ভাটার সময় নদীর বুক চিরে যখন কাদামাটির চর ভেসে ওঠে, তখনই শুরু হয় এক অন্য যুদ্ধ। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে সদ্য গজিয়ে ওঠা ম্যানগ্রোভের চারা। নদীর জলে ভেসে আসা বীজ কুড়িয়ে কেউ তৈরি করছেন চারা, আবার কেউ কোমরসমান কাদা মাড়িয়ে সেই চারা বসিয়ে দিচ্ছেন নদীর পাড়ে। সুন্দরবনের গোসাবার চারঘেরি গ্রামে দাঁড়িয়ে বুঝতে অসুবিধা হয় না, এটি শুধু বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নয়, প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার এক নিরলস আন্দোলন। আর সেই আন্দোলনের মুখ উমাশঙ্কর মণ্ডল।

স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি "ম্যানগ্রোভ ম্যান"। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা প্রাচীরকে ফিরিয়ে আনতে নিজের জীবনটাই উৎসর্গ করেছেন তিনি।
 

উমাশঙ্করের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বারবার ফিরে আসে ২০০৯ সালের বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় 'আয়লা'-র স্মৃতি। সেই ভয়ঙ্কর দিনটি আজও যেন তাঁর চোখে ভাসে। নদীর কয়েক মিটার উঁচু ঢেউ কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে বাড়িঘর ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, অসহায় মানুষ কীভাবে সব হারিয়েছিল, সেই দৃশ্যই বদলে দিয়েছিল তাঁর জীবন। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে প্রথমে ফিরিয়ে আনতে হবে ম্যানগ্রোভের সবুজ বর্ম।
 
পেশায় ভূগোলের শিক্ষক হওয়ায় তিনি জানতেন, ম্যানগ্রোভ শুধু গাছ নয়, উপকূলের জীবন্ত প্রাচীর। এই বনই ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ কমায়, জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা সামলায়, ভূমিক্ষয় রোধ করে এবং সুন্দরবনের সূক্ষ্ম বাস্তুতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই কোনও সরকারি প্রকল্পের অপেক্ষা না করে তিনি নিজেই শুরু করেন ম্যানগ্রোভ রোপণের কাজ।
 
সুন্দরবনের গোসাবার চারঘেরি গ্রামের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির একটি দৃশ্য
 
প্রথম দিকে কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। নদীর জলে ভেসে আসা বাইন, গরান-সহ বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভের বীজ সংগ্রহ করতে শুরু করেন তিনি। গ্রামের মহিলারাও এগিয়ে আসেন। তাঁদের হাতেই তৈরি হতে থাকে হাজার হাজার চারা। এরপর নদীর পাড়, ভাঙনপ্রবণ এলাকা ও খালি জমিতে শুরু হয় রোপণ। ধীরে ধীরে এই উদ্যোগ রূপ নেয় এক বৃহৎ জনআন্দোলনে।
 
আজ সেই উদ্যোগের নাম 'ম্যানগ্রোভ আর্মি'। এই স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর বড় অংশই মহিলা ও কিশোর-কিশোরী। কেউ বীজ সংগ্রহ করেন, কেউ নার্সারিতে চারা বড় করেন, আবার কেউ নদীর কাদা মাড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে গাছ লাগান। অনেক সময় তাঁদের উৎসাহ দিতে শাড়ি, মশারি, প্রয়োজনীয় পোশাক কিংবা স্বাস্থ্যবিধির সামগ্রীও তুলে দেওয়া হয় শুভানুধ্যায়ীদের অনুদানের অর্থে। উমাশঙ্করের কথায়, মানুষকে সঙ্গে না নিলে সুন্দরবনকে বাঁচানো সম্ভব নয়।
 
সুন্দরবনের গোসাবার চারঘেরি গ্রামের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির একটি দৃশ্য
 
বছরের পর বছর ধরে তাঁর নেতৃত্বে গোসাবা, সাতজেলিয়া, কুমিরমারি, স্বরূপকাঠি-সহ সুন্দরবনের একাধিক দ্বীপে লক্ষ লক্ষ ম্যানগ্রোভের চারা রোপণ হয়েছে। বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় ১৩ লক্ষে পৌঁছেছে। একসময় যেখানে নদীর পাড় ছিল অনাবৃত, আজ সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে সবুজ ম্যানগ্রোভের সারি। অনেক এলাকায় ইতিমধ্যেই এই বন ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কা সামলানোর শক্তি অর্জন করেছে।
 
শুধু গাছ লাগিয়েই থেমে থাকেননি উমাশঙ্কর। তাঁর বিশ্বাস, প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হলে আগামী প্রজন্মকে শিক্ষিত করাও জরুরি। সেই ভাবনা থেকেই চারঘেরি গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন 'পূর্বাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়'। সেখানে স্থানীয় শিশুদের পাশাপাশি ম্যানগ্রোভ আর্মির সদস্যদেরও পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব শেখানো হয়।
 
তাঁর এই অসাধারণ উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছে। সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে দীর্ঘদিনের নিরলস কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২১ সালে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (WWF)-এর মর্যাদাপূর্ণ 'Dr. Rimington Award (Living with Tigers)' সম্মানে ভূষিত হন তিনি। পরিবেশবিদদের মতে, উমাশঙ্করের তৈরি এই মডেল সুন্দরবনের অন্য দ্বীপগুলিতেও সহজেই অনুসরণ করা সম্ভব।
 
সুন্দরবনের গোসাবার চারঘেরি গ্রামের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির একটি দৃশ্য
 
তবে এত সম্মান, এত পরিচিতির পরেও উমাশঙ্করের কথায় নেই কোনও আত্মপ্রচার। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু বললেন, "ম্যানগ্রোভ বাঁচলে তবেই সুন্দরবন বাঁচবে। সুন্দরবন বাঁচলে তবেই মানুষ বাঁচবে। তাই যত বেশি সম্ভব ম্যানগ্রোভ লাগাতে হবে। এখন শুধু সুন্দরবনের মানুষ নয়, দেশ-বিদেশ থেকেও অনেকেই এই কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এই লড়াই চালিয়ে যেতে চাই।"
 
সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ সবুজের দিকে তাকালে বোঝা যায়, একজন মানুষের জেদ কখনও কখনও ইতিহাস লিখে দেয়। উমাশঙ্কর মণ্ডলের হাত ধরে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, আজ তা হাজার মানুষের স্বপ্ন। প্রকৃতিকে ভালোবাসার এই অদম্য লড়াই প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি থাকলে একজন সাধারণ মানুষও গোটা অঞ্চলের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারেন।


শেহতীয়া খবৰ