রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য এবার আন্তর্জাতিক পর্দায়, অভিবাসনের গল্পে ‘দ্য টেগোর ট্রিলজি’
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য, দর্শন ও মানবতাবাদী চিন্তাকে এবার আন্তর্জাতিক সিনেমার ভাষায় নতুন করে তুলে ধরার উদ্যোগ। সিঙ্গাপুর, ভারত ও ব্রিটেনের যৌথ প্রযোজনায় তৈরি হতে চলেছে তিনটি ইংরেজি ভাষার ছবির বিশেষ প্রকল্প—‘দ্য টেগোর ট্রিলজি’। রবীন্দ্রনাথের তিন নৃত্যনাট্য থেকে অনুপ্রাণিত এই তিন ছবির কেন্দ্রে থাকবে অভিবাসন, পরিচয়ের সংকট, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ এবং নতুন পৃথিবীতে নিজের জায়গা খুঁজে নেওয়ার গল্প।
ট্রিলজির তিনটি ছবির নাম ‘সোল বাউন্ড’, ‘সোল লস্ট’ এবং ‘সোল ফাউন্ড’। তিনটি ছবির কাহিনি আলাদা হলেও তাদের মধ্যে একটি অভিন্ন মানবিক সুর থাকবে। নিজের দেশ, শিকড় ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি দেওয়া মানুষের মানসিক টানাপড়েন, সম্পর্কের পরিবর্তন এবং নতুন সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াইকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হবে।
অভিবাসনের বিষয়টি বর্তমান বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শনের মেলবন্ধন ঘটিয়েই তৈরি হবে এই সিনেমাগুলি। নির্মাতাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ট্রিলজির প্রথম ছবিটি ২০২৭ সালের মে মাসে মুক্তি পেতে পারে। ইংরেজি ভাষায় নির্মিত হওয়ায় ছবিগুলির লক্ষ্য শুধু ভারতীয় দর্শক নয়, আন্তর্জাতিক দর্শকমহলও।
এই প্রকল্পে রবীন্দ্রনাথের ভাবনাকে সরাসরি পুনর্নির্মাণের বদলে সমকালীন জীবনের সঙ্গে তার সংলাপ তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট, বিভিন্ন সংস্কৃতির চরিত্র, বিশ্বসঙ্গীত এবং আধুনিক সিনেমার ভাষার মাধ্যমে তাঁর দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই নির্মাতাদের অন্যতম লক্ষ্য।
‘দ্য টেগোর ট্রিলজি’র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন অরিন্দম দে। প্রযোজনার পাশাপাশি এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগে যুক্ত রয়েছেন ভারত ও বিদেশের একাধিক শিল্পী ও কলাকুশলী। সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন বিক্রম ঘোষ। শিল্প নির্দেশনার ক্ষেত্রে থাকছেন শিল্পী হিরণ মিত্র-সহ আরও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিভা।
রবীন্দ্রনাথের ‘শাপমোচন’, ‘শ্যামা’ এবং ‘মায়ার খেলা’ নৃত্যনাট্যকে ভিত্তি করেই তিনটি ছবির ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এগুলি সরাসরি নৃত্যনাট্যের চিত্ররূপ নয়। মূল সৃষ্টির ভাবনা ও মানবিক দ্বন্দ্বকে সমকালীন গল্পের কাঠামোয় এনে আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা হবে।প্রকল্পের ভাবনা প্রসঙ্গে পরিচালক অরিন্দম দে জানিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের প্রতিটি চিন্তার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ভাবে সবসময় একমত হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তাঁর সাহিত্য ও দর্শন যে মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়, সেই প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। মতের পার্থক্য ও বিরোধ থেকেও কী ভাবে নতুন সৃষ্টির জন্ম হতে পারে, রবীন্দ্রনাথের ভাবনার সেই দিকটিই এই ট্রিলজির অন্যতম ভিত্তি বলে জানিয়েছেন পরিচালক।
ফলে ‘দ্য টেগোর ট্রিলজি’ শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য অবলম্বনে নির্মিত তিনটি সিনেমা নয়। বরং তাঁর ভাবনার সঙ্গে আজকের পৃথিবীর মানুষের জীবন, সংকট ও পরিচয়ের প্রশ্নের একটি নতুন কথোপকথন। দেশান্তরী মানুষের চোখ দিয়ে শিকড়, ভালোবাসা এবং ‘নিজের জায়গা’ খোঁজার যে চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা—রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির আলোয় সেই গল্পই এবার পৌঁছতে চলেছে আন্তর্জাতিক সিনেমার পর্দায়।