শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষে যখন বাঙালি ফিরে দেখছে তার প্রিয় নায়কের বর্ণময় জীবন, তাঁর অভিনয়, তাঁর অমর সৃষ্টি এবং বাংলা সিনেমায় তাঁর অসামান্য অবদান, ঠিক তখনই যেন খুলে গেল আর একটি পুরনো দরজা। সেই দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিও ছিলেন অভিনয়েরই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। কিন্তু তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এমন এক বিশাল নাম, যার আলোয় নিজের আলাদা দীপ্তি নিয়ে জ্বলে ওঠার সুযোগ হয়তো তিনি কখনও পুরোপুরি পাননি। তিনি তরুণ চট্টোপাধ্যায়—বাঙালির প্রিয় অভিনেতা তরুণ কুমার, ডাকনাম ‘বুড়ো’।
তাঁকে ঘিরেই প্রকাশিত হল একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ—‘চির তরুণ’। রবিবার বিকেলে কিছুটা অনাড়ম্বর পরিবেশে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ পেল বইটি। অনুষ্ঠানে ছিল না জাঁকজমকের বাড়াবাড়ি, ছিল না তারকার মেলা। বরং ছিল স্মৃতি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং একজন শক্তিমান অভিনেতাকে নতুন করে মনে করার আন্তরিক প্রয়াস।
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিলেন তরুণ কুমারের নাতি, অভিনেতা সৌরভ এবং তাঁর অভিনেত্রী স্ত্রী ত্বরিতা চট্টোপাধ্যায়। তাঁদের উপস্থিতি যেন অনুষ্ঠানে এনে দিয়েছিল এক আন্তঃপ্রজন্মের সেতুবন্ধন। একদিকে বাংলা সিনেমার এক স্বর্ণযুগের অভিনেতার স্মৃতি, অন্যদিকে সেই পরিবারের নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা—দুই সময় যেন একই মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছিল।
উপস্থিত ছিলেন শহরের সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রজগতের কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষ এবং তরুণ কুমারের পরিবারের সদস্যরা। আলোচনায় বারবার ফিরে এসেছে একটি প্রশ্ন—তরুণ কুমারের মতো একজন দক্ষ অভিনেতা কি তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি পেয়েছিলেন?বক্তাদের অনেকেই মনে করিয়ে দেন, তরুণ কুমার শুধু মহানায়ক উত্তম কুমারের ভাই ছিলেন না। তাঁর নিজেরও ছিল স্বতন্ত্র অভিনয়সত্তা। চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার ক্ষমতা, সংলাপ বলার নিজস্ব ভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি এবং সহজাত অভিনয় দক্ষতা তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের এক অত্যন্ত পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য অভিনেতায় পরিণত করেছিল। নায়ক, সহ-অভিনেতা কিংবা চরিত্রাভিনেতা—বিভিন্ন ভূমিকাতেই তিনি নিজের দক্ষতার ছাপ রেখেছেন।
কিন্তু বাঙালির চোখে তাঁর পরিচয়ের প্রথম শব্দটি হয়ে দাঁড়িয়েছিল—‘উত্তম কুমারের ভাই’। আর সেখানেই যেন তৈরি হয়েছিল এক অদৃশ্য দেওয়াল। দাদা যখন হয়ে উঠেছেন বাঙালির স্বপ্নের মহানায়ক, তখন ভাইয়ের নিজস্ব কৃতিত্ব অনেক সময়ই সেই বিশাল পরিচয়ের নিচে চাপা পড়েছে। তাঁর অভিনয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তাঁকে ভালোবাসাও দিয়েছে দর্শক, কিন্তু সেই অর্থে ‘স্টারডম’ বা প্রাপ্য মর্যাদার শিখরে তিনি পৌঁছতে পারেননি।এ যেন বাংলা সিনেমার এক অদ্ভুত পরিহাস। একই পরিবার থেকে দুই প্রতিভাবান শিল্পী। একজন হয়ে উঠলেন কিংবদন্তি, অন্যজন রয়ে গেলেন কিংবদন্তির অত্যন্ত কাছের অথচ খানিকটা আড়ালে থাকা মুখ।
‘চির তরুণ’ সেই আড়াল সরিয়ে তরুণ কুমারকে নতুন করে দেখার চেষ্টা। বইটির প্রকাশ যেন শুধু একটি জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ নয়, বরং বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের একটি অবহেলিত অধ্যায়কে নতুন করে পাঠ করার আহ্বান।অনুষ্ঠানে বক্তাদের কথায় উঠে আসে সেই আক্ষেপও—এত বড় মাপের অভিনেতা হয়েও তরুণ কুমার তাঁর যোগ্যতার তুলনায় যথেষ্ট স্বীকৃতি পাননি। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর অবদান আরও বড় জায়গা পাওয়ার দাবি রাখে। তাঁর অভিনয় নিয়ে আরও আলোচনা হওয়া উচিত ছিল, তাঁর কাজ নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া উচিত ছিল—এমন মতও উঠে আসে অনুষ্ঠানে।
তরুণ কুমারের জীবনের দিকে তাকালে তাই শুধু একজন অভিনেতার জীবনকথা দেখা যায় না। দেখা যায় এক শিল্পীর নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ লড়াই। মহানায়কের ভাই হওয়া যেমন তাঁর জন্য গর্বের, তেমনই হয়তো সেটিই হয়ে উঠেছিল তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়-সংকট। উত্তম কুমারের বিপুল জনপ্রিয়তা তাঁর পরিবারের জন্য যেমন আশীর্বাদ, তরুণ কুমারের ক্ষেত্রে তেমনই তা হয়ে উঠেছিল এক ধরনের ছায়া।
আজ উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ। তাঁর অভিনয়, তাঁর রোম্যান্টিক উপস্থিতি, তাঁর হাসি, তাঁর চোখের ভাষা—সবই নতুন প্রজন্মের কাছেও আলোচনার বিষয়। সেই আলোয় দাঁড়িয়েই এবার তরুণ কুমারের দিকে ফিরে তাকানোর সময় এসেছে। কারণ শিল্পীর মূল্য কখনও তাঁর আত্মীয়তার পরিচয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। একজন অভিনেতাকে বিচার করতে হয় তাঁর নিজের কাজ দিয়ে, তাঁর শিল্প দিয়ে, তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি দিয়ে।
তরুণ কুমার সেই পরীক্ষায় বহু আগেই উত্তীর্ণ। তাই হয়তো তাঁর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দটিই বইয়ের নাম—‘চির তরুণ’।সময়ের পর্দা সরলে আজও দেখা যায় সেই পরিচিত মুখ। হয়তো পাশে নেই মহানায়কের বিপুল আলো, নেই তারকাখ্যাতির ঝলক। কিন্তু অভিনয়ের জগতে তাঁর নিজস্ব আলোটুকু এখনও নিভে যায়নি। আর সেই আলোতেই জন্মশতবর্ষের আবহে তাঁকে নতুন করে আবিষ্কারের এই প্রয়াস হয়ে উঠল এক আবেগময় শ্রদ্ধাঞ্জলি।মহানায়ক উত্তম কুমার বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল থাকবেন। আর তাঁর পাশে, তাঁর ছায়ার আড়াল থেকে এবার যেন একটু সামনে এসে দাঁড়ালেন তাঁর ভাই—তরুণ কুমার। চির তরুণ।