অংক শেখাতে শিক্ষকের দুর্দান্ত বুদ্ধি! সবজি বাজারকে আস্ত ক্লাসরুম বানিয়ে ৫০ টাকার নোটে অঙ্কের ‘লাইভ’ পরীক্ষা ধূপগুড়িতে

Story by  Tarun Nandi | Posted by  Aparna Das • 9 h ago
অংক শেখাতে শিক্ষকের দুর্দান্ত বুদ্ধি! সবজি বাজারকে আস্ত ক্লাসরুম বানিয়ে ৫০ টাকার নোটে অঙ্কের ‘লাইভ’ পরীক্ষা ধূপগুড়িতে
অংক শেখাতে শিক্ষকের দুর্দান্ত বুদ্ধি! সবজি বাজারকে আস্ত ক্লাসরুম বানিয়ে ৫০ টাকার নোটে অঙ্কের ‘লাইভ’ পরীক্ষা ধূপগুড়িতে
 
তরুণ নন্দী / কলকাতা

সুকুমার রায় বহু বছর আগেই লিখেছিলেন ‘বিদ্যে বোঝাই বাবুমশাই’-এর কথা। তার মূল নির্যাস ছিল পুথিঁগত বিদ্যায় ষোলো আনা পূর্ণ হলেও জীবনের আসল হিসেবে তাঁরা একপ্রকার শূন্য। তাই পড়ুয়াদের বাস্তবের মুখোমুখি করতে অংক শেখানোর ক্লাস নিয়ে আসা হল সবজি বাজারে।  পঠনপাঠনের সেই চেনা ছক ভেঙে বাস্তব উপযোগী এক পাঠশালা বসাল উত্তরবঙ্গের এক বাংলা মাধ্যম স্কুল। চার দেওয়ালের ব্ল্যাকবোর্ড ভুলে জলপাইগুড়ির ধূপগুড়ির শ্রী শ্রী নিত্যকমলানন্দ সারদা শিশু মন্দিরের ক্লাসরুম সোজা চলে এলো কোলাহলমুখর সবজি বাজারে। হাতে-কলমে অংক শেখানোর এই অভিনব উদ্যোগ রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছে গোটা এলাকায়।
 
স্কুল সূত্রে খবর, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর ২৪ জন পড়ুয়াকে নিয়ে এই অভিনব ‘গণিত বাজার’-এর আয়োজন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য একটাই, পড়ুয়াদের এক বাস্তব বুদ্ধির কঠিন পরীক্ষায় দাঁড় করানো। শিক্ষকদের সুপরিকল্পিত ভাবনায় প্রতিটি পড়ুয়ার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল নগদ ৫০ টাকা আর বাজারের ব্যাগ। টাস্ক একটাই, তাদের হাতে থাকা এই নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে পছন্দমতো সবজি কিনতে হবে হিসেব কষে।
 

শিক্ষকের অনুমতি পেয়েই থলি হাতে বাজারের এমাথা-ওমাথা ঘুরে দাম-দরের হিসেবে করতে মেতে যায় পড়ুয়াদের দল। কেজি প্রতি দামের ওপর ভিত্তি করে ১০০ গ্রাম পটল বা ২৫০ গ্রাম আলুর দাম কত হবে, হিসেব করে বিক্রেতাকে টাকা দেওয়ার পর ঠিক কত ফেরত পাওয়া উচিত সবটাই লক্ষ্য রাখলেন শিক্ষকেরা। কোনো ক্যালকুলেটর বা খাতা-পেন্সিল ছাড়াই বাজারের দরদামের সেই জটিল হিসেব মুখে মুখে কষে ফেলতে দেখা গেল পড়ুয়াদের। সীমিত বাজেটে কীভাবে সর্বোচ্চ লাভজনক উপায়ে বাজার করা যায়, তা যেন মুহূর্তে শিখে ফেলল পড়ুয়ারা।
 
সবজি কেনা শেষে পড়ুয়ার চোখে-মুখে ছিল যেন কোন কঠিন যুদ্ধ জয়ের আনন্দ। এমন অংক শেখার পাঠশালায় উপস্থিত হয়ে পড়ুয়ারা জানাল, খাতায় কলমে যে হিসেব করতে গিয়ে অনেক সময় মাথা গুলিয়ে যেত, বাজারে এসে সবজি দরদাম করে কিনে সেই যোগ-বিয়োগ যেন ম্যাজিকের মতো সহজ হয়ে গেল। এই অভিনব গণিত বাজার নিয়ে শিক্ষদের প্রতিক্রিয়া ছিল, আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্কুলের পড়ুয়াদের মধ্যে থেকে অংকের চিরন্তন ভীতিকে দূর করা। সত্যি কথা বলতে কি, বইয়ের প্রথাগত জ্যামিতি-বীজগণিত অনেক সময়ই বাস্তব জীবনের দরদাম বা লেনদেনে কাজে লাগে না। এই জড়তা কাটাতেই আমরা শ্রেণিকক্ষকে নিয়ে এসেছি স্থানীয় বাজারে। দরদাম করে জিনিসপত্র কেনাকাটার এই অভিজ্ঞতা হয়ত ওদের অঙ্কের ভয় তাড়িয়ে ভবিষ্যতের জন্য আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।
 
অভিভাবকরাও স্কুলের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ দেখে রীতিমত আপ্লুত। তাঁদের মতে, এই শিক্ষা তাদের সন্তানদের জীবনের রুক্ষ মাটিতে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর রসদ জোগাবে। ধূপগুড়ির এই স্কুল দেখিয়ে দিল, শিক্ষাকে যদি বাস্তবমুখী করে তোলা যায় তবে যেকোনো কঠিন বিষয়ই সহজাত হয়ে পড়বে। পুঁথিগত বিদ্যার বোঝাকে সরিয়ে রেখে জীবনমুখী এই পাঠশালা রীতিমত দৃষ্টান্ত স্থাপন করল শিক্ষাজগতে।