স্থায়ী আমানতের সুদে প্রতি বছর বাংলায় সেরাদের হাতে উঠবে স্কলারশিপ, অবসরেও পড়ুয়াদের পাশে কল্যাণী বন্দ্যোপাধ্যায়
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
চাকরি ছেড়েছেন বছর বাইশ। কর্মজীবনের ব্যস্ততা, ক্লাসঘরের কোলাহল, খাতার পাতায় লাল কালির দাগ, সবই এখন অতীত। তবু একটি স্কুলকে মন থেকে কখনও অবসর দেওয়া যায়নি। তাই বহু বছর পর পুরনো কর্মস্থলে ফিরে এসে প্রাক্তন শিক্ষিকা কল্যাণী বন্দ্যোপাধ্যায় তুলে দিলেন এক লক্ষ টাকা। নিজের হাতে গড়ে ওঠা সেই বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্যই তাঁর এই উপহার।
আউশগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষিকা কল্যাণীর এই অনুদান শুধু অর্থসাহায্য নয়, যেন তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকজীবনের প্রতি ভালোবাসারই আর এক প্রকাশ। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, ওই এক লক্ষ টাকা ব্যাঙ্কে স্থায়ী আমানত হিসেবে রাখা হবে। তার লভ্যাংশ থেকে প্রতি বছর মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় বাংলায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের স্কলারশিপ দেওয়া হবে। অর্থাৎ, শিক্ষকতা থেকে অবসর নিলেও পড়ুয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা থেকে গেল একই জায়গায়, বাংলা ভাষা ও শিক্ষার হাত ধরে।
কলকাতার বাসিন্দা কল্যাণী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ করেন। পরে এলএলবিও পাশ করেন। আইনজীবী হওয়ার পথও খুলে গিয়েছিল তাঁর সামনে। কলকাতা হাইকোর্টে আইনচর্চা শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু মনের ভিতরে তখন অন্য এক টান। ছোট থেকেই শিক্ষকতা করার স্বপ্ন ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নের টানেই বদলে গেল জীবনের গতিপথ।
১৯৭৮ সাল। পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের অজান্তেই আউশগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের সহ-শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দিলেন কল্যাণী। শুধু এক বোন জানতেন তাঁর সিদ্ধান্তের কথা। শহর থেকে দূরে এসে শিক্ষকতা করার সেই সিদ্ধান্ত হয়তো সে সময় অনেকের কাছেই বিস্ময়ের ছিল। কিন্তু কল্যাণীর কাছে সেটিই ছিল নিজের পছন্দের জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ।
তার পরের ২৬ বছর কেটে গেল ক্লাসঘরে। ১৯৭৮ থেকে ২০০৪, দীর্ঘ শিক্ষকজীবনে কত ব্যাচের ছাত্রছাত্রী যে তাঁর হাত ধরে বাংলার অক্ষর চিনেছে, তার হিসাব নেই। শুধু পাঠ্যবইয়ের পাঠ নয়, ছাত্রছাত্রীদের মানুষ করে তোলার চেষ্টাতেও ছিলেন তিনি সক্রিয়। সহকর্মী ও প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের কাছে তাই কল্যাণী শুধু ‘বাংলার দিদিমণি’ নন, ছিলেন ছাত্রদরদী এক শিক্ষক।
সময়ের সঙ্গে স্কুল বদলেছে, বদলেছে ছাত্রছাত্রীরাও। বদলেছে শিক্ষাদানের পদ্ধতি। কিন্তু পুরনো সম্পর্কের জায়গাটি বোধ হয় বদলায়নি। কর্মজীবন শেষ হওয়ার বহু বছর পরেও সেই স্কুলের কথা মনে রেখেছেন কল্যাণী। অবসরজীবনে এখন তিনি গুসকরা পুরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের আলুটিয়া গ্রামে থাকেন। আউশগ্রাম থানার অন্তর্গত সেই এলাকায় তাঁর দিন কাটে নিজের মতো করে। কিন্তু মনের এক কোণে রয়ে গিয়েছে পুরনো স্কুলের স্মৃতি।
সেই টানেই সম্প্রতি আবার স্কুলে যাওয়া। সঙ্গে ছিল এক লক্ষ টাকার অনুদান। প্রধান শিক্ষকের হাতে অর্থ তুলে দেওয়ার মুহূর্তে যেন ফিরে এসেছিল বহু পুরনো দিনের সেই সম্পর্ক, শিক্ষক আর বিদ্যালয়ের সম্পর্ক, যা চাকরির মেয়াদে শেষ হয় না।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কল্যাণীর দেওয়া টাকা স্থায়ী আমানতে রাখা হবে। সেই আমানত থেকে যে লভ্যাংশ আসবে, তা দিয়ে প্রতি বছর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে বাংলায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া পড়ুয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হবে স্কলারশিপ। ফলে এক বার দেওয়া অর্থ থেকে প্রতি বছরই তৈরি হবে নতুন অনুপ্রেরণা। এক প্রজন্মের শিক্ষকতার স্মৃতি পৌঁছে যাবে পরের প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীর হাতে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তকির মণ্ডলের কথায়, ‘‘দিদির এই উদ্যোগ ছাত্রছাত্রীদের আরও উৎসাহিত করবে। তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে বাংলায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপকদের স্কলারশিপ দেওয়া হবে।’’
এ দিন বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কল্যাণী বন্দ্যোপাধ্যায়কে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়। অবসর নেওয়ার পরে অনেকেই কর্মজীবনের স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে বাঁচেন। কেউ পুরনো সহকর্মীর কথা মনে করেন, কেউ ছাত্রছাত্রীদের। কল্যাণী বন্দ্যোপাধ্যায় একটু অন্য ভাবে স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁর দেওয়া এক লক্ষ টাকা হয়তো সংখ্যায় খুব বড় নয়। কিন্তু সেই টাকার সুদে প্রতি বছর যখন কোনও পড়ুয়ার হাতে পুরস্কার উঠবে, তখন তার সঙ্গে জুড়ে থাকবে এক প্রাক্তন শিক্ষিকার দীর্ঘ ভালোবাসার গল্প।
ক্লাসঘর ছেড়েছেন তিনি অনেক দিন আগে। কিন্তু শিক্ষকতা? তা বোধ হয় ছাড়েননি। শুধু চক-ডাস্টারের বদলে এখন তাঁর শিক্ষাদানের মাধ্যম হয়ে উঠেছে একটি ছোট্ট তহবিল, যার সুদে, প্রতি বছর, বাংলার প্রতি ভালোবাসার নতুন গল্প লেখা হবে।