লখনউয়ের ডা. ফারহীন বানু তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতিতে কী পরিবর্তন এনেছেন?

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 2 Months ago
ডা. ফারহীন বানু
ডা. ফারহীন বানু
 
আরসলা খান / নয়াদিল্লি

একজন প্রকৃত শিক্ষক শুধু বইয়ের পাতায় জ্ঞান সীমাবদ্ধ রাখেন না, বরং শিক্ষার্থীদের বাস্তব জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। লখনউয়ের ডঃ ফারহীন বানু এই কথাটি অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করেছেন। তাঁর উদ্ভাবনী শিক্ষাদান পদ্ধতির মাধ্যমে তিনি শুধু ছাত্রছাত্রীদের মনই জয় করেননি, আজ দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষক পুরস্কারও অর্জন করেছেন।

ড. ফারহিন বানো ড. এপিজে আব্দুল কালাম টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি (AKTU)-এর স্থাপত্য ও পরিকল্পনা বিভাগের একজন সিনিয়র সহকারী অধ্যাপক। তিনি ২০২৩ সালের জাতীয় শিক্ষক পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হন এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছ থেকে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন।

রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার গ্রহণ করছেন ড. ফারহীন বানু

শিক্ষাদানের একটি উদ্ভাবনী পদ্ধতি: '৬০:৪০ কৌশল'

ফারহিন বানু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, স্থাপত্যের মতো বিষয়ে শুধু বই পড়ে দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই তিনি শিক্ষাদানের একটি বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যার নাম দিয়েছেন ‘৬০:৪০ শিখন কৌশল’।

এই কৌশল অনুসারে, ৬০ শতাংশ শিক্ষা শ্রেণিকক্ষের বাইরে সম্পন্ন হয়। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ভবন দেখানো হয়, তারা সরেজমিনে গবেষণা করে এবং বাস্তব প্রকল্পে হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ পায়। বাকি ৪০ শতাংশ শিক্ষা শ্রেণিকক্ষে বই ও তত্ত্বের মাধ্যমে প্রদান করা হয়। তিনি বিশ্বাস করেন যে, শিশুরা যখন কোনো কিছু নিজের চোখে দেখে এবং নিজেরা সেটির ওপর কাজ করে, তখন তারা তা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে।

ডাঃ ফারহীন বানু শ্রেণীকক্ষে পাঠদান করছেন

১৫ বছরের বর্ণময় অভিজ্ঞতা

ফারহীন বানুর স্থাপত্য ও শিক্ষকতা ক্ষেত্রে ১৫ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি আইআইটি রুরকি থেকে স্থাপত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি একেটিইউ থেকে পরিবেশগত নকশায় পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি একই সাথে একজন স্থপতি, গবেষক এবং একজন আদর্শ শিক্ষিকা।

পরিবেশ-বান্ধব ভবনগুলির উপর বিশেষ জোর

ফারহীন বানু বিশেষত পরিবেশবান্ধব ও কল্যাণকর ভবন নির্মাণ নিয়ে কাজ করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের শেখান যে, ভবন নির্মাণের সময় শুধু তার বাহ্যিক সৌন্দর্যের দিকে তাকালেই চলবে না, বরং এটি কী পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ করবে এবং পরিবেশের উপর এর কী প্রভাব পড়বে, সে বিষয়েও গভীরভাবে ভাবতে হবে।

তাঁর অধ্যয়ন ও গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রগুলো হলো—

পরিবেশ অনুযায়ী ভবন নকশা 
শক্তি সাশ্রয়ী ভবন
টেকসই এবং নিরাপদ নির্মাণ
সেউজ গৃহ 
আধুনিক মডেলিং কৌশল

 
ভবিষ্যৎ স্থপতিদের জন্য তার একটি বড় স্বপ্ন হলো, তারা এমন ভবন নির্মাণ করবে যা দেখতে সুন্দর হবে এবং পরিবেশের জন্যও আশীর্বাদস্বরূপ হবে।

ফারহীন গবেষণাতেও পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।

ডঃ ফারহিন বানো শুধু অধ্যাপনাতেই সীমাবদ্ধ নন। তিনি গবেষণার জগতেও কাজ করে চলেছেন। তিনি শীর্ষস্থানীয় জার্নালগুলিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। এছাড়াও তিনি ইন্ডিয়ান গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণকে সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করেন।

এই সাফল্যের নেপথ্যের ব্যক্তিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা

জাতীয় শিক্ষক পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হওয়ার পর ফারহীন বানু এটিকে তাঁর জীবনের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, তাঁর উদ্ভাবিত '৬০:৪০ শিখন কৌশল' আজ যে স্বীকৃতি পেয়েছে, তাতে তিনি অত্যন্ত গর্বিত। তিনি তাঁর এই সাফল্যের জন্য স্বামী মোহাম্মদ তাহসিন, ডিন অধ্যাপক বন্দনা সেহগাল এবং বিভাগীয় প্রধান ঋতু গুলাতিকেও কৃতিত্ব দেন।

তিনি অতীতে অনেক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন।

ফারহীন বানো অতীতে অনেক পুরস্কার জিতেছেন। তিনি এর আগে ‘আন্তর্জাতিক শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য গবেষক পুরস্কার’ লাভ করেছেন। এছাড়াও তিনি ‘অসামান্য শিক্ষক পুরস্কার’-এ ভূষিত হয়েছেন।
 

তিনি শুধু একজন শিক্ষিকাই নন, বরং তরুণ প্রজন্মের জন্য একজন নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শকও।

ফারহীন বানুর জীবনকাহিনী প্রমাণ করে যে, শিক্ষাদানের পদ্ধতি আকর্ষণীয় ও উদ্ভাবনী হলে শিক্ষার্থীরা যেকোনো বিষয় খুব সহজে ও ভালোভাবে শিখতে পারে। তিনি শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি। তাদের বাইরের বাস্তব জগৎ দেখিয়েছেন, বাস্তব প্রকল্পে কাজ করতে শিখিয়েছেন এবং বইয়ের তাত্ত্বিক জ্ঞানকে জীবনের ব্যবহারিক দিকের সাথে যুক্ত করেছেন।

আজ তাঁর কঠোর পরিশ্রম ও স্বতন্ত্র চিন্তাভাবনা তাঁকে দেশের অন্যতম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফারহীন বানুর সাফল্যের পথ প্রত্যেক সেই সব শিক্ষকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস, যাঁরা গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করতে এবং তাঁদের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়তে চান। তিনি সমাজকে দেখিয়েছেন যে, একজন শিক্ষক শুধু পড়ানই না, তিনি তাঁর ব্যতিক্রমী শিক্ষাদান পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের চিন্তাভাবনা ও ভবিষ্যৎ দুটোই বদলে দিতে পারেন।