প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে ডাক্তার হলেন নিহা তসলিম তামান্না, মেয়েদের শিক্ষায় সমাজকে আরও দায়িত্বশীল হতে আহ্বান

Story by  Nurul Haque | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
ডক্টর নিহা তাসলিম তামান্না
ডক্টর নিহা তাসলিম তামান্না
 
নূরুল হক / আগরতলা

রাজ্যের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এমবিবিএস পড়া শেষ করে ডাক্তার হলেন মুসলিম মেয়ে নিহা তাসলিম তামান্না। ত্রিপুরার উত্তর জেলার কৈলাশহর ধরলিয়ারকান্দি গ্রামের প্রয়াত শিক্ষক হান্নান আলী এবং মা রেহানা বেগম-র সুযোগ্য কন্যা ডক্টর নিহা তাসলিম তামান্না। তামান্না এ বছর ত্রিপুরা সরকারি মেডিকেল কলেজ হাঁপানিয়া থেকে এমবিবিএস কমপ্লিট করেছেন। গ্রামের মেয়ের এই সাফল্যে খুশির জোয়ার বইছে কৈলাশহর ধরলিয়ারকান্দী গ্রামে।
 
মা বাবার একমাত্র কন্যা তামান্না অক্লান্ত পরিশ্রম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর দীর্ঘদিনের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই নিজের এবং সমাজের জন্য এই সাফল্য অর্জন করতে পেরেছেন। তামান্না এবং তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় গ্রামের বাড়ি থেকে উঠে একমাত্র মেয়ের এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক আবেগঘন গল্প।
 
ডিগ্রি গ্রহণের মুহূর্তে ডক্টর নিহা তাসলিম তামান্না
 
বাবা প্রয়াত আব্দুল হান্নান ছিলেন তামান্নার স্বপ্নপূরণের নীরব প্রেরণা। মুসলিম সমাজের একটা অংশ যেখানে মেয়েকে বোরখা এবং হিজাবের আড়ালে রেখে ধর্ম শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন, সেখানে আব্দুল হান্নান ছোট থেকেই মেয়েকে সাফল্যের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। তামান্নার মা বলেন তামান্নাকে নিজের মতো করে বড় করে তুলতে যাতে কোন ধরনের সমস্যা না হয় সে জন্য তার বাবা দ্বিতীয় সন্তানের কথা চিন্তা করেননি।
 
তামান্নার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে প্রাথমিক বিভাগে সে স্থানীয় একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল সহ একটি মক্তবে পড়াশোনা করেন। মক্তবে পড়ে সে মুসলিম ধর্মীয় রীতিনীতি এবং কোরান খতম দেন। একইভাবে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে বুনিয়াদি শিক্ষায় সে ইংরেজি সহ-সাধারণ শিক্ষায় পারদর্শিতা অর্জন করে।
 
কিন্তু শহর থেকে অনেকটা দূরে গ্রামের মধ্যে মেয়ের স্বাভাবিক পড়াশোনা চালানো কিছুটা প্রতিকূল ছিল। তাই প্রাথমিক শিক্ষার পরই আব্দুল হান্নান মেয়ের শিক্ষার জন্য স্ত্রী এবং মেয়েকে পাঠিয়ে দেন জেলা শহর ধর্মনগরে। মা রেহানা বেগম মেয়ের ছায়া সঙ্গী হয়ে বাড়িঘর ছেড়ে মেয়ের সঙ্গে ভাড়া থাকতে শুরু করেন।
 
ডক্টর নিহা তাসলিম তামান্না
 
ধর্মনগরে ভগিনী নিবেদিতা উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল থেকে তামান্না সব বিষয়ে লেটার পেয়ে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়। এরপরেই পরবর্তী শিক্ষার জন্য মা মেয়ে চলে আসেন আগরতলায়। আগরতলার ঐতিহ্যবাহী মহারানী তুলসীবতী স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করেন তামান্না। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাতেও তিনি সমস্ত বিষয়ে লেটার মার্ক পেয়ে প্রথম বিভাগে পাস করেন। তারপরেই সর্বভারতীয় ডাক্তারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে হাঁপানিয়া ত্রিপুরা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন তামান্না।
 
২০২১ সালে এমবিবিএস ভর্তি হওয়ার পর সাফল্যের সাথে কোর্স শেষ করে এ বছর ১৮ এপ্রিল এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন নিহা তাসলিম তামান্না। তবে তামান্নার এই সাফল্যের সাথে লুকায়িত রয়েছে তার বাবা হারানোর করুন কাহিনী। যে বাবার দুই চোখ মেয়ের উজ্জ্বল সাফল্যের জন্য নিরলস প্রতীক্ষা করেছিল মেয়ের পড়া শেষ করার আগেই সেই চোখ দুটি  চিরদিনের মতো বন্ধ হয়ে যায়।
 
শিক্ষক আব্দুল হান্নান গ্রামের গণ্ডি এবং ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার ঊর্ধ্বে তামান্নাকে সাফল্যের আকাশে ওড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু তামান্না এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হওয়ার মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে লাঞ্চ ক্যান্সার হয়ে মারা যান শিক্ষক আব্দুল হান্নান। বাবার মৃত্যুতে পিছিয়ে পড়েনি তামান্না। বরং বাবার স্বপ্নকে সাফল্যে পৌঁছে দিতে তামান্না আরো আগ্রহী হয়ে ওঠেন। মাকে সঙ্গে নিয়ে সে আগরতলা থাকতে শুরু করে এবং হাঁপানিয়া ত্রিপুরা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস কোর্স শেষ করেন
 

জন্মের পর যে ছোট্ট তামান্নাকে কোলে নিয়ে সফল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন শিক্ষক আব্দুল হান্নান সেই স্বপ্ন আজ বাস্তব রূপ পেয়েছে। তামান্নার এই সাফল্যে তার পরিবার আত্মীয় সহ গোটা গ্রাম গর্বিত হয়ে উঠেছে। তামান্নার সঙ্গে কথা বললে সে জানায় তার এই সাফল্য সে তার মা এবং প্রয়াত বাবাকে উৎসর্গ করতে চাইছেন। একইভাবে তিনি জানান আগামী দিনে তিনি মেডিসিন বিভাগে মাস্টার্স করতে চান এবং নিজের গ্রামেই সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা পরিষেবা দিতে চান। চিকিৎসা বিজ্ঞানে মাস্টার্স করতে আপাতত তিনি পিজি নিট পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
 
নিজের এক শুভেচ্ছা বার্তায় তামান্না ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার ঊর্ধ্বে মেয়েদেরকে আধুনিক শিক্ষার মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তোলার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তামান্না বলেন একটা মেয়ে শিক্ষিত হলে সে শুধু নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যায় না বরং গোটা একটা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে যাতে সমাজ আরো দায়িত্বশীলতার সাথে এগিয়ে চলে।