ড. অতনু নাথ
শতানন্দ ভট্টাচার্য / হাইলাকান্দি
ড. অতনু নাথ ‘বিজ্ঞান জগতের অস্কার’ (Oscars of Science) নামে পরিচিত ২০২৬ সালের ব্রেকথ্রু প্রাইজ ইন ফান্ডামেন্টাল ফিজিক্স লাভ করেছেন। তিনি বিশ্বজুড়ে ৩৭৬ জন বিজ্ঞানীর সঙ্গে এই সম্মান ভাগ করে নিয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ১১ জন ভারতীয় রয়েছেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, তিনি উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রথম এবং একমাত্র বিজ্ঞানী, যিনি ব্রেকথ্রু প্রাইজ ইন ফান্ডামেন্টাল ফিজিক্সে স্বীকৃতি পেলেন। এ বছর এই পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে CERN, ব্রুকহ্যাভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি (BNL) এবং Fermilab-এর মিউঅন জি−২ (Muon g−2) গবেষণা কর্মসূচিকে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সূক্ষ্ম নির্ভুলতা-ভিত্তিক পরীক্ষাগুলিকে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এক বড় মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
এই পুরস্কার বিশ্ববিজ্ঞানের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে বিবেচিত হয় এবং একে প্রায়শই “বিজ্ঞান জগতের অস্কার” (Oscars of Science) বলা হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই নির্ভুলতা-ভিত্তিক পরীক্ষাগুলিকে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এক বড় মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বলে জানান ড. নাথ। দক্ষিণ অসমের হাইলাকান্দি জেলার লালাবাজারের বাসিন্দা ড. অতনু নাথ বর্তমানে নলবাড়ি জেলার টিহু কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
ড. অতনু নাথ তাঁর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে
তাঁর এই সাফল্যে নিজ অঞ্চলসহ সমগ্র অঞ্চলের শিক্ষা ও গবেষণা মহলে গর্ব ও আনন্দের সঞ্চার হয়েছে। তিনি লালাবাজারের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক বীরেন্দ্র কুমার নাথ এবং অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষিকা বিনতা রানি নাথের দ্বিতীয় পুত্র। হাইলাকান্দির এক শিক্ষাবিদ বলেন, ড. নাথের এই স্বীকৃতি অসম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের শিক্ষাজগতের জন্য এক তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। তাঁর এই অর্জন প্রমাণ করে যে নিষ্ঠা, অধ্যবসায় এবং মানসম্মত শিক্ষা মানুষকে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দিতে পারে।
ড. নাথ শিলচরের গুরুচরণ কলেজে (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) স্নাতক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে তিনি কলকাতার এস. এন. বোস ন্যাশনাল সেন্টার ফর বেসিক সায়েন্সেস থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (TIFR)-এ উচ্চতর পড়াশোনা করেন। ২০১৩ সালে তিনি ইতালির ইউনিভার্সিটি অব নেপলস ফেদেরিকো দ্বিতীয়-এ অধ্যাপক জিয়ানকার্লো ডি’অ্যামব্রোসিওর তত্ত্বাবধানে ডক্টরাল গবেষণার জন্য যোগ দেন। সেখানে তিনি কোয়ান্টাম ক্রোমোডাইনামিক্স (QCD) বিষয়ে গবেষণা করেন। ২০১৬ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
পরবর্তীতে তিনি অধ্যাপক মিশেল ইয়াকোভাচ্চির মিউঅন জি−২ গবেষণাগারে প্রথমে অতিথি গবেষক এবং পরে ২০১৭ সালে পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে যোগ দেন। এই কাজের মাধ্যমে তিনি ফার্মিল্যাবের আন্তর্জাতিক সহযোগী গবেষণা দলের অংশ হন এবং ২০২০ সাল পর্যন্ত এই পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রকল্পে তিনি লেজার ক্যালিব্রেশন সিস্টেমে কাজ করেন, যা ডিটেক্টরের নির্ভুলতা নিশ্চিত করার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নেপলস গ্রুপ বিশেষভাবে সোর্স মনিটরিং সিস্টেমের দায়িত্বে ছিল এবং ড. নাথ মিউঅন ক্যাম্পাসে এই কাজে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি রান-৩ চলাকালীন রান কো-অর্ডিনেটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে এসে তিনি আইআইটি গুয়াহাটিতে পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি হাই এনার্জি ফিজিক্স ল্যাবরেটরিতে কাজ করার পাশাপাশি ফার্মিল্যাবের DUNE এবং NOvA নিউট্রিনো পরীক্ষাতেও অবদান রাখেন। একই সময়ে তিনি শিলচর-ভিত্তিক গবেষণা উদ্যোগ সেন্টার অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড ইনোভেশন ল্যাব (CASILAB)-এরও মূল সদস্য হন। ২০২২ সালে ড. নাথ টিহু কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।
ড. অতনু নাথ
শনিবার ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মনিকায় বার্কার হ্যাঙ্গারে অনুষ্ঠিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনটি গবেষণা কর্মসূচির পক্ষে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন ব্রুকহ্যাভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির অন্তর্বর্তীকালীন পরিচালক জন হিল, ফার্মিল্যাবের পদার্থবিজ্ঞানী ক্রিস পলি, বোস্টন ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানী লি রবার্টস, ফার্মিল্যাবের সাবেক পরিচালক ইয়ং-কী কিম, সার্নের ডিরেক্টর-জেনারেল মার্ক থমসন, ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের পদার্থবিজ্ঞানী ডেভিড হার্টজগ এবং ব্রুকহ্যাভেন ল্যাবের পদার্থবিজ্ঞানী উইলিয়াম মর্স।
উল্লেখ্য, ব্রেকথ্রু প্রাইজ ফাউন্ডেশন ২০১২ সালে এই পুরস্কার চালু করে। এর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে রয়েছেন সের্গেই ব্রিন, প্রিসিলা চ্যান ও মার্ক জাকারবার্গ, ইউরি ও জুলিয়া মিলনার এবং অ্যান ওজসিকি। বৈপ্লবিক আবিষ্কার ও মৌলিক গবেষণাকে সম্মান জানাতে প্রতিষ্ঠিত এই পুরস্কারের মোট অর্থমূল্য ৩০ লক্ষ মার্কিন ডলার এবং এটি বিজ্ঞানের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও সর্বোচ্চ আর্থিক পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বছরের পুরস্কারটি কেন্দ্রিত হয়েছে মিউঅন নামক মৌলিক কণার চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে কয়েক দশকের গবেষণার ওপর। মিউঅনকে প্রায়শই ইলেকট্রনের ভারী আত্মীয় বলা হয়। মিউঅন একটি ক্ষুদ্র চুম্বকের মতো আচরণ করে এবং চৌম্বক ক্ষেত্রে তার সূক্ষ্ম গতিবিধি অত্যন্ত নির্ভুলভাবে পরিমাপ করা যায়। তত্ত্ব ও পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে কোনো অমিল দেখা গেলে তা অজানা কণা, নতুন বল বা বর্তমান তত্ত্বের সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দিতে পারে। এই কারণেই মিউঅন জি−২ কর্মসূচিকে কণা পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্ভুলতা-ভিত্তিক পরীক্ষা হিসেবে ধরা হয়।