তিন শিখার আলোয় যে ইতিহাস—ধুলোয় লুটিয়ে যাদবপুরের নন্দলাল-সৃষ্টি, ক্ষত শুধু একটি প্রতীকের নয়
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
কোনও কোনও প্রতীক শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের নাম বা পরিচয় বহন করে না। তার মধ্যে জমা থাকে একটি সময়ের ইতিহাস, একটি শিক্ষাদর্শ, শিল্পীর ভাবনা এবং বহু প্রজন্মের আবেগ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথের ঐতিহাসিক প্রতীকটিও তেমনই। নন্দলাল বসুর শিল্পভাবনায় নির্মিত সেই প্রতীকের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় শিল্প-ঐতিহ্য, শিক্ষার দর্শন এবং একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি।সেই ঐতিহাসিক প্রতীক ও তার প্রতিরূপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ছবি তাই কেবল একটি কাঠামো ভেঙে যাওয়ার দৃশ্য নয়। তার মধ্যে ধরা পড়ে একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের উপর আঘাতের বেদনা।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকে শিল্পীর স্বাক্ষর যাদবপুরের ইতিহাসের সঙ্গে জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে দেশীয় শিক্ষাচিন্তার যে আন্দোলন বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় তৈরি হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতাতেই জাতীয় শিক্ষা পরিষদের জন্ম।
পরবর্তীকালে ১৯৫৫ সালে যাদবপুর পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পায়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়কে ধারণ করার মতো একটি প্রতীকের প্রয়োজন দেখা দিলে দায়িত্ব দেওয়া হয় নন্দলাল বসুকে।ভারতীয় আধুনিক শিল্পের ইতিহাসে নন্দলাল বসুর অবস্থান অনন্য। শান্তিনিকেতনের কলাভবনের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক, ভারতীয় শিল্পের দেশজ ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস এবং সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপির অলঙ্করণে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তাঁকে জাতীয় শিল্প-ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
তাঁর হাতে যাদবপুরের প্রতীক তৈরি হওয়া তাই নিছক একটি নকশা তৈরির ঘটনা ছিল না। একটি নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনকে ভারতীয় শিল্পভাষায় প্রকাশ করার প্রয়াসও ছিল তা।পদ্ম, প্রদীপ আর তিনটি শিখাপ্রতীকটির নকশায় প্রথমেই চোখে পড়ে পদ্মের উপস্থিতি। ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতিতে পদ্মের প্রতীকী ব্যঞ্জনা বহুমাত্রিক—পবিত্রতা, সৌন্দর্য, বিকাশ এবং জ্ঞানের সঙ্গে যার দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে।
তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রদীপ।প্রদীপের তিনটি শিখাই প্রতীকটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ। এগুলি শিক্ষার তিনটি মৌলিক মাত্রার প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়—বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, আবেগ ও কল্পনার বিকাশ এবং আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিকাশ।অর্থাৎ, শিক্ষা এখানে শুধুমাত্র পরীক্ষার ফল বা তথ্য অর্জনের বিষয় নয়। জ্ঞান, সৃজনশীলতা, মানবিকতা এবং চরিত্র—সবকিছুর সম্মিলিত বিকাশই শিক্ষার উদ্দেশ্য।
প্রতীকের সঙ্গে যুক্ত বাণী—‘জাতম্ অস্তি বৃদ্ধি প্রাপ্নুয়াৎ’, যার ভাবার্থ ‘জানলে, জানার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা’—এই দর্শনকেই আরও স্পষ্ট করে।
নন্দলালের শিল্পভাবনা কেন আলাদাবিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক হিসেবে নন্দলাল বসু এমন কোনও ভারী, জটিল বা পাশ্চাত্য ধাঁচের প্রতীক বেছে নেননি, যা দূর থেকে শুধু প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা বা মর্যাদা ঘোষণা করবে।বরং তাঁর নকশায় রয়েছে সরলতা।
কম রেখা, কম উপাদান, কিন্তু প্রতিটি উপাদানের গভীর অর্থ। এই সংযমই নন্দলালের শিল্পভাবনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ভারতীয় শিল্পের নিজস্ব প্রতীক ও নান্দনিকতাকে আধুনিকতার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার যে প্রয়াস তাঁর কাজে দেখা যায়, যাদবপুরের প্রতীকেও তার ছাপ স্পষ্ট।সেই কারণে প্রতীকটি সময়ের সঙ্গে পুরনো হয়ে যায়নি। বরং বহু প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীর কাছে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।একটি ফলক মানে শুধু ধাতু বা পাথর নয়বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও পুরনো দরজা, ফলক, প্রতীক কিংবা ভবনকে বাইরে থেকে দেখলে সেটি হয়তো কেবল একটি স্থাপত্য বা বস্তু বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু তার সঙ্গে যখন কয়েক দশক বা শতকের স্মৃতি যুক্ত হয়, তখন তার মূল্য আর বস্তুগত থাকে না।যাদবপুরের ঐতিহাসিক প্রতীকও তেমন।
কত ছাত্রছাত্রী প্রথমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে প্রবেশের সময় সেটির সামনে দাঁড়িয়েছেন। কত তরুণ-তরুণী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় শুরু করেছেন এই প্রতীককে সামনে রেখে। কত শিক্ষক, গবেষক, শিল্পী ও প্রাক্তনী নিজেদের পরিচয়ের সঙ্গে এই প্রতীককে মিলিয়ে দেখেছেন।
একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতীক তখন ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে তার সম্মিলিত স্মৃতির অংশ।সেই স্মৃতিতেই আঘাত,সাম্প্রতিক ঘটনায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেটের ঐতিহাসিক প্রতীক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ছবি সামনে এসেছে। ভাঙা কাঠামো, মাটিতে পড়ে থাকা প্রতীকের অংশ এবং ধুলোয় লুটিয়ে থাকা সেই শিল্পরূপের দৃশ্য স্বাভাবিকভাবেই সাংস্কৃতিক মহলে প্রশ্ন তুলেছে।
কোনও আন্দোলন, মতপার্থক্য বা উত্তেজনার মুহূর্তে স্থাপত্য ও শিল্পসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার পুনর্গঠন হয়তো সম্ভব। ভাঙা কাঠামো নতুন করে তৈরি করা যায়। কিন্তু একটি ঐতিহাসিক প্রতীকের সঙ্গে যে সময়ের স্মৃতি, শিল্পীর সৃষ্টিশীলতা এবং প্রজন্মের আবেগ জড়িয়ে থাকে, সেটিকে নতুন করে তৈরি করা যায় না।
একটি প্রতিরূপ পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব, কিন্তু তার পুরনো সময়কে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।ঐতিহ্য রক্ষার দায় সবারঐতিহ্য কোনও একটি মত, সংগঠন বা রাজনৈতিক পরিচয়ের সম্পত্তি নয়। কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক স্থাপত্য, শিল্পকর্ম কিংবা প্রতীকও কোনও নির্দিষ্ট প্রজন্মের একার নয়।সেগুলি আসলে সমগ্র সমাজের সাংস্কৃতিক সম্পদ।
তাই মতপার্থক্য থাকতেই পারে। আন্দোলন হতে পারে। প্রতিবাদ হতে পারে। তীব্র বিতর্কও হতে পারে। কিন্তু সেই সবকিছুর মধ্যেও ঐতিহাসিক শিল্প ও স্থাপত্যকে রক্ষা করার দায় থেকে যায়।কারণ একটি প্রজন্ম যখন কোনও ঐতিহ্য নষ্ট করে ফেলে, পরের প্রজন্মের হাতে তা তুলে দেওয়ার মতো কিছু আর থাকে না।
তিন শিখা কি আবার জ্বলবে?
আজ ধুলোয় পড়ে থাকা নন্দলাল বসুর সেই সৃষ্টির দিকে তাকালে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে তার তিনটি শিখার কথা।বুদ্ধির আলো। সৃজনশীলতার আলো। মানবিক ও নৈতিক বিকাশের আলো।একটি প্রতীকের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু তার অন্তর্নিহিত দর্শনকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে না দেওয়াই হয়তো সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে থাকা সেই প্রতীক তাই শুধু অতীতের স্মারক নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু ইট-পাথরের ভবন নয়, আর ঐতিহ্য শুধু পুরনো কোনও বস্তু নয়।ঐতিহ্য হল উত্তরাধিকার।আর উত্তরাধিকারকে বাঁচিয়ে রাখার অর্থ কেবল ভাঙা প্রতীক মেরামত করা নয়; তার অর্থ তার ইতিহাস, শিল্পমূল্য এবং দর্শনকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
ধুলোয় লুটিয়ে থাকা তিন শিখার প্রতীক তাই হয়তো আজ ক্ষতবিক্ষত। কিন্তু তার অর্থ এখনও অমলিন—জ্ঞানকে ধারণ করো, সৃষ্টিশীলতাকে বিকশিত করো, আর মানবিকতার আলোকে সামনে এগিয়ে চলো।