ইংরেজি প্রবন্ধে 'দেশসেরা' সুন্দরবনের দিনমজুরের কন্যা সেলিমা মোল্লা! অসাধ্য সাধন করেও কপালে চিন্তার ভাঁজ, লালকেল্লা যাওয়ার খরচ জোগাবে কে?
তরুণ নন্দী / কলকাতা
সুন্দরবনের বাসন্তী এলাকার মেয়ে সেলিমা মোল্লা। পড়ে ক্লাস নাইনে। ভাঙা বেড়ার এক চিলতে ঘরে থেকেও মেধার জোরে ১৫ই আগস্ট দিল্লির লালকেল্লায় যাওয়ার ডাক পেয়েছে। দিনমজুর বাবার পক্ষে মেয়ের যাতায়াতের খরচ জোগানো অসম্ভব। তাই এই বিরল সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় কান্নায় ভেঙে পড়েছে দরিদ্র পরিবারের এই মেধাবী ছাত্রী।
সুন্দরবনের মেঠো পথ ধরে প্রতিদিন ৩০ মিনিট সাইকেল চালিয়ে সেলিমা মোল্লাকে স্কুলে পৌঁছাতে হয়। কিন্তু তাঁর মেধার পরিচয় এখন এলাকার সকলের মুখে মুখে ঘুরছে। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘বিকশিত ভারত’ অনলাইন প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় বাসন্তীর এই কিশোরী সারা দেশের লক্ষ লক্ষ প্রতিযোগীকে টেক্কা দিয়ে সে সাফল্য পেয়েছে। ইংরেজি ভাষায় নিজের ভাবনাকে অসম্ভব দক্ষতায় উপস্থাপনা করে সেলিমা জিতে নিয়েছে ১৫ই আগস্টে দিল্লির লালকেল্লায় স্বাধীনতা দিবসের মূল অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার রাজকীয় নিমন্ত্রণ।
খবর শোনার পর থেকে সেলিমার ঘরে আনন্দের বদলে জমা হয়েছে এক গভীর দুশ্চিন্তা। কারণ একটাই, দিল্লি পৌঁছানোর রেলভাড়াটুকু জোগাড় করার সামর্থ নেই এই হতদরিদ্র পরিবারের কাছে। সেলিমার বাবা-মা গভীর আক্ষেপ নিয়ে জানালেন, মেয়ে দিল্লি যাওয়ার আমন্ত্রণ পেলেও আমাদের সাধ্য নেই ওকে লালকেল্লার অনুষ্ঠানে পাঠানোর। যদি কোন সহায়তা মেলে তবেই হয়ত ও যেতে পারবে দিল্লিতে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সুন্দরবন অঞ্চলের বাসন্তীর আমঝাড়া গ্রামের ফুলমালঞ্চ ঋতু ভকত উচ্চমাধ্যমিক হাইস্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে সেলিমা। চার ভাই-বোনের মধ্যে সেলিমা সবার বড়। বাবা সেলিম মোল্লা দিনমজুরী করে কোনরকম সংসারটা চালান, আর মা রেহেনা বেগম গৃহবধূ। নুন আনতে পান্তা ফুরোনো সংসারে অভাব-অনটন যেন এই সংসারে নিত্যসঙ্গী।
সেই পরিবারের মেয়ে আজ নিজের যোগ্যতায় সারা দেশকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। আজ সেলিমার এই অনন্য সাফল্যে অত্যন্ত গর্বিত স্কুলের প্রধান শিক্ষক অম্বরীশ কুমার দত্ত থেকে শুরু করে গোটা এলাকার মানুষ। প্রধান শিক্ষক অম্বরীশ দও জানালেন, সেলিমার এই সাফল্য গোটা সুন্দরবনের গর্ব। এই প্রথম তাদের স্কুলের কোন ছাত্রী এই সম্মান পেয়েছে। তার এই স্বপ্নপূরণে তিনি পাশে থাকবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সেলিমা মোল্লা তার মায়ের সঙ্গে
খুশির এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সেলিমার স্বপ্নের সামনে এখন প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবারের অভাব অনটন। কোনোভাবে আর্থিক সাহায্য না পাওয়া গেলে হয়ত লালকেল্লার ঐতিহাসিক মঞ্চে সুন্দরবনের প্রতিনিধিত্ব করার বিরল সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে সেলিমার। পরিবারের কথা ভেবে সেলিমা জানায়, সরকারিভাবে যদি যাতায়াতের খরচ ও সাহায্যের ব্যবস্থা করা হয়, তবেই লালকেল্লায় যাওয়া সম্ভব হবে।
মেধার শক্তিতে সাফল্য মিললেও অর্থের অভাবে কি থমকে যাবে সুন্দরবনের এক অতি সাধারণ দিনমজুরের মেয়ের এই স্বপ্ন? প্রশ্ন এখন একটাই, আদৌ মিলবে কি সাহায্যের হাত, নাকি অভাবের আঁধারেই হারিয়ে যাবে একটি খাঁটি মেধার স্বপ্ন।