বাঁশভিত্তিক প্লাস্টিক: চীনা বিজ্ঞানীদের বিপ্লবী উদ্ভাবন যা প্লাস্টিক দূষণের অবসান ঘটাবে
সুদীপ শর্মা চৌধুরী, গুয়াহাটি
চীনের সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা একটি অসাধারণ আবিষ্কার করেছেন—এক ধরনের বাঁশভিত্তিক প্লাস্টিক, যা পেট্রোলিয়াম-ভিত্তিক সাধারণ প্লাস্টিকের মতোই শক্তিশালী, কিন্তু মাত্র ৫০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে জৈব-বিঘটিত হয়ে যায়। এই উদ্ভাবন প্রাকৃতিক বাঁশের ফাইবার এবং উদ্ভিদ-উদ্ভূত পলিমারের সমন্বয়ে তৈরি, যা প্যাকেজিং, কনটেইনার, খাদ্যকৌটা এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যের জন্য একটি টেকসই বিকল্প।
সাধারণ প্লাস্টিক যা শত শত বছর পরিবেশে অটুট থেকে যায় এবং বিষাক্ত দূষণ সৃষ্টি করে, এই বাঁশভিত্তিক উপাদান মাটি বা জলে দ্রুত বিঘটিত হয়ে কোনও ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশ রাখে না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ব্যাপকভাবে এটি গ্রহণ করলে বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক বর্জ্য কমে যাবে এবং ফসিল ফুয়েলের উপর নির্ভরতা অনেকটা হ্রাস পাবে।
কীভাবে তৈরি হলো এই 'সুপার প্লাস্টিক'?
সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, যা ১৮৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চীনের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, এখানকার গবেষকরা বাঁশের সেলুলোজকে মলিকুলার স্তরে ভেঙে নতুনভাবে গঠন করেছেন। গবেষণায় ব্যবহৃত পদ্ধতি হলো একটি অ-বিষাক্ত অ্যালকোহল-ভিত্তিক দ্রাবক (solvent) দিয়ে বাঁশের সেলুলোজকে দ্রবীভূত করা, যাতে এটি প্লাস্টিকের মতো শক্তিশালী মলিকুলার নেটওয়ার্ক গঠন করতে পারে। বাঁশের গুঁড়ো (bamboo powders) এবং পলিইমাইন (polyimine) নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে তৈরি এই উপাদান (BP/PI) তাপ প্রয়োগ করে পুনর্মডেলিং, রিহিলিং এবং রিশেপিং করা যায়—যেন একটি থার্মোপ্লাস্টিক।
গবেষণায় দেখা গেছে, এর টেনসাইল স্ট্রেংথ (tensile strength) ১১০ মেগাপাস্কাল (MPa) এবং ফ্লেক্সুরাল স্ট্রেংথ (flexural strength) ১২১.৯ MPa, যা সাধারণ প্লাস্টিক এবং অন্যান্য বায়োপ্লাস্টিকের চেয়ে উন্নত। এছাড়া, এটি জল এবং জৈব দ্রাবকের প্রতি উচ্চ রোধক্ষমতা দেখায়। বাঁশের প্রাকৃতিক উপাদান—সেলুলোজ (৫০.৮%), হেমিসেলুলোজ (২৫.৯%) এবং লিগনিন (২১.৮%)—হাইড্রোজেন বন্ডের মাধ্যমে পলিমারের সাথে মিশে এই শক্তি প্রদান করে। ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি (FT-IR) এবং এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন (XRD) পরীক্ষায় এর অ্যামর্ফাস এবং ক্রিস্টালাইন গঠন নিশ্চিত হয়েছে। এই উদ্ভাবন 'নেচার' জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, যা এর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব তুলে ধরে।
পরিবেশ এবং অর্থনীতির উপর প্রভাব: একটি সবুজ বিপ্লব ।প্রতি বছর বিশ্বে ৪০০ মিলিয়ন টনেরও বেশি প্লাস্টিক উৎপন্ন হয়, যার অধিকাংশ সমুদ্র এবং মাটিতে জমে বিষাক্ততা ছড়ায়। এই বাঁশভিত্তিক প্লাস্টিক ৫০ দিনে মাটিতে বিঘটিত হয়ে যায়, যা কাগজের চেয়েও দ্রুত—স্টাইরোফোমের মতো একক-ব্যবহার্য প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে আদর্শ। বাঁশ দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদ (বছরে ১ মিটার পর্যন্ত), যা পুনর্নবীকরণযোগ্য এবং চীনের মতো দেশে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। গবেষক দাওয়েই জাও (Dawei Zhao) বলেছেন, "বাঁশের দ্রুত বৃদ্ধি এটিকে টেকসই কাঁচামাল করে তোলে, যা ঐতিহ্যবাহী কাঠের বিকল্প।"
অর্থনৈতিকভাবে, এটি ফসিল ফুয়েল-ভিত্তিক শিল্পকে চ্যালেঞ্জ করবে। চীনের 'বাঁশ প্লাস্টিকের বিকল্প' উদ্যোগ এই দিকে এগোচ্ছে, যা বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক দূষণ কমাতে সাহায্য করবে। উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য এটি সস্তা এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প, যা খাদ্য প্যাকেজিং থেকে শুরু করে মেডিকেল কনটেইনার পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য। তবে চ্যালেঞ্জ রয়েছে—উৎপাদন খরচ কমানো এবং বাজারে প্রবেশ। গবেষণা চীনের ন্যাশনাল ন্যাচারাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন দ্বারা অর্থায়িত, যা এর বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বাড়ায়।
কি পরিবর্তন আনবে এটি?
এই উদ্ভাবন শুধু প্লাস্টিক শিল্প নয়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাতেও ভূমিকা রাখবে। যদি ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে বার্ষিক কয়েক মিলিয়ন টন CO2 নির্গমন কমবে। চীনের মতো দেশ যেখানে বাঁশের বনভূমি বিশাল, সেখানে এটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি 'ক্লোজড-লুপ রিসাইক্লেবল'—পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব। আশা করা যায়, শীঘ্রই এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশ করে প্লাস্টিকের 'অমরত্ব' ভাঙবে।
এই আবিষ্কার পরিবেশ রক্ষার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা।