আশা খোঁসা
আজরা নকভি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, কিন্তু তাঁর হৃদয়ের মূলে আছে উর্দু, যে ভাষায় তিনি শ্বাস নেন, চিন্তা করেন, এবং যা তাঁর রক্তে মিশে আছে। স্বামীসহ নানা দেশে বসবাস, ভিন্ন ভিন্ন পেশা ও ভূমিকা গ্রহণ সত্ত্বেও, তাঁর হৃদয় সবসময়ই টান অনুভব করেছে প্রিয় ভাষা উর্দুর প্রতি।
২০১৭ সালে দিল্লিতে ফিরে এসে আজরা তাঁর ভালোবাসার এই ভাষার জন্য এক কর্মক্ষেত্র খুঁজে পান। তিনি রেখতা ফাউন্ডেশন-এর পরামর্শদাতা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন, একটি সংস্থা যা উর্দু ভাষার সংরক্ষণ ও প্রসারে কাজ করে। রেখতা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অনলাইন উর্দু কবিতা ভান্ডার হিসেবে পরিচিত, যেখানে মাত্র এক ক্লিকেই পাঠকেরা খুঁজে পান খাঁটি উর্দু সাহিত্য। রেখতার পাঠকসংখ্যা ১৫০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে রয়েছে, এবং এটি উর্দুর প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ ফিরিয়ে আনার কৃতিত্ব অর্জন করেছে।
কবিতার ভাষা উর্দুর প্রেমে মগ্ন আজরা নকভি হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাপ্লিকেশনকে ব্যবহার করলেন এক অভিনব উপায়ে। তিনি প্রথমে ২০০ জন উর্দু নারী লেখিকাকে সংযুক্ত করে গঠন করলেন বিশ্বের প্রথম নারী সাহিত্য সংগঠন, বৈনালাকওয়ামি নিসসাই আদাবি তানজিম (বানাত), যার অর্থ “আন্তর্জাতিক নারী সাহিত্য সংস্থা”।
এই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে তিনি লেখিকাদের সাহিত্যকর্ম প্রচার করেন এবং তাঁদের মধ্যে এক “লেখিকা-ভগ্নিত্ব” গড়ে তোলেন। ৪০ জন নারী লেখিকার বিষয়ভিত্তিক লেখা তিনি এই গ্রুপের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছেন। “গ্রুপে ধর্ম বা সাহিত্যবহির্ভূত কোনো আলোচনা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ,” জানালেন তিনি আওয়াজ-দ্য ভয়েস পত্রিকাকে।
আজরা নকভি
এই গ্রুপের মাধ্যমে সংগৃহীত গল্পগুলো বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। দুটি বই, ‘সব লোগ কয়া কহেঙ্গে’ (লোকেরা কী বলবে) এবং ‘ইয়াদোঁ কে ঝরোকে সে’ (স্মৃতির জানালা থেকে) প্রকাশের প্রস্তুতিতে আছে। তৃতীয় সংকলন, ‘জো অকসার ইয়াদ আতে হ্যায়ন’ (যে স্মৃতিগুলো প্রায়ই ফিরে আসে), প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বানাত সদস্যরা প্রতিবছর এক সাহিত্যিক মিলনমেলায় একত্রিত হন। “এই বছরের নবম অধিবেশন অক্টোবরে মধ্যপ্রদেশের ভোপালে অনুষ্ঠিত হবে,” ললেন আজরা শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে। বর্তমানে তিনি রেখতার ব্যুৎপত্তি-সংক্রান্ত প্রকল্পে কাজ করছেন, যার লক্ষ্য হিন্দি-উর্দু-ইংরেজি বহুভাষিক অভিধান তৈরি করা, ভবিষ্যতে এতে গুরুমুখী (পাঞ্জাবি লিপি) যোগ করা হবে।
কয়েক বছর আগে স্বামীকে হারানোর পর আজরা নকভি এখন নয়ডায় থাকেন, কিন্তু ৭৩ বছর বয়সেও তাঁর জীবন প্রাণবন্ত। “আমি শব্দের এক জাদুকরী জগতে বাস করি; এই জগত সীমাহীন, অসীম সম্ভাবনায় ভরপুর,” তাঁর কণ্ঠে এমন এক জীবনীশক্তি যা মৃত মনকেও জাগিয়ে তুলতে পারে।
জাভেদ আখতারের সঙ্গে আজরা নিকভির একটি ছবি
আজরার উর্দুপ্রেম উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত। তিনি এমন এক পরিবারে জন্মেছেন যেখানে বই ও সাহিত্যিকদের সান্নিধ্য ছিল প্রতিদিনের অংশ। “যদিও আমি ফরাসি ভাষাও ভালোবাসি, যা আমি কানাডায় থাকাকালীন শিখেছিলাম, তবু আমি কেবল উর্দুতে চিন্তা করি, উর্দুতেই অনুভব করি, আর উর্দুতেই নিজেকে সর্বোত্তমভাবে প্রকাশ করতে পারি,” বললেন তিনি। তাঁর দাদা ছিলেন দিল্লির কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয় জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর মা ছিলেন একজন কবি ও বিদুষী নারী, যিনি উর্দুতে অনুবাদিত বিশ্বসাহিত্য পাঠ করতেন।
১৯৫৭ সালে আজরার পরিবার আলীগড়ে চলে যায়, তাঁর বাবার আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির কারণে। আজরা পড়াশোনা করেন আব্দুল্লাহ গার্লস হাই স্কুলে, যা এখন এএমইউ-র অংশ। পারিবারিক চাপে তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) থেকে অভিযোজন জীববিজ্ঞানে এম.ফিল সম্পন্ন করেন, কিন্তু মনের ভিতরে তাঁর উর্দু লেখার তৃষ্ণা থেকেই যায়।
জগজিৎ সিং - এর সঙ্গে আজরা নকভির একটি ছবি
১৯৭৬ সালে, তাঁর মধ্য-বিশের দশকে, তিনি এক কম্পিউটার বিজ্ঞানীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর তাঁদের জীবনযাত্রা তাঁকে নিয়ে যায় ইরাক ও কানাডায়। মন্ট্রিলে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence)-এ পিএইচডি কোর্সে ভর্তি হন, ফরাসি ভাষা শেখেন এবং সেখানে একটি কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতাও করেন। কানাডায় ১২ বছর থাকার সময়, তিনি দক্ষিণ এশীয় নারীদের ক্ষমতায়নে কাজ করেন। তাঁদের ফরাসি ভাষা ও কর সংক্রান্ত জ্ঞান শেখান, যা কানাডায় বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।
পরে তিনি রিয়াধের কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়েও কাজ করেন। আজরা স্মৃতিচারণ করে বলেন, “সৌদি আরবে ১৫ বছর থাকা অবস্থায় কিছু নিয়ম আমাকে দমবন্ধ মনে হতো, তবে আমি সেখানে সেবা নামে একটি ভারতীয় শিশুদের নার্সারি ও মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জযুক্ত শিশুদের বিশেষ যত্নকেন্দ্রে চার-পাঁচ বছর কাজ করেছি।”
একটি মিডিয়া ইন্টারভিউতে আজরা নকভি
তাঁর প্রথম উর্দু-সংযোগ ঘটে যখন তিনি ‘ভয়েসেস অফ চেঞ্জ’ নামের এক বই ইংরেজি থেকে উর্দুতে অনুবাদ করেন। এটি ৬০-এর দশকের সৌদি নারী লেখিকাদের গল্পসংকলন ছিল। “আমি বিস্মিত হয়েছিলাম, কী সাহসিকতার সঙ্গে তারা নিজেদের সমস্যা নিয়ে লিখেছে!” বললেন আজরা। তাঁর অনুবাদিত বইটির নাম রাখা হয়েছিল ‘সৌদি কালামকার আওরতোঁ কি মুনতাখিব কাহানিয়াঁ’।
এরপর তিনি নিজের ১৫টি উর্দু ছোটগল্প নিয়ে প্রকাশ করেন বই ‘আঙ্গন জব পরদেশ হুয়া’, যেখানে অভিবাসীদের সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন ও বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে। ১১টি উর্দু গ্রন্থের লেখিকা আজরা নকভি দৃঢ়ভাবে বলেন, “মানুষের উর্দু ও হিন্দি, দুই ভাষাতেই পড়া ও লেখা শেখা উচিত। এখনকার বাচ্চারা উর্দু জানে না, হিন্দিও না, এটা ভীষণ কষ্টের।”