দিল্লির অগ্নিকাণ্ডে ৫ মুসলিম যুবকের বীরত্ব, বহু প্রাণ বাঁচিয়ে কুড়ালেন প্রশংসা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
অফজল, মোহাম্মদ শাহরুখ, মোহাম্মদ আনীশ, মোহাম্মদ আমির, এবং মোহাম্মদ ওয়াসিম, সাথে সতীশ উপাধ্যায় (সতীশ উপাধ্যায়ের এক্স পোস্ট)
অফজল, মোহাম্মদ শাহরুখ, মোহাম্মদ আনীশ, মোহাম্মদ আমির, এবং মোহাম্মদ ওয়াসিম, সাথে সতীশ উপাধ্যায় (সতীশ উপাধ্যায়ের এক্স পোস্ট)
 
নয়াদিল্লি

দক্ষিণ দিল্লির মালভিয়া নগরে একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে যখন চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, তখন মানবতার অনন্য নজির গড়লেন পাঁচ স্থানীয় মুসলিম যুবক। দিল্লি পুলিশের সঙ্গে একযোগে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়ে তাঁরা বহু আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদে বের করে আনতে সাহায্য করেন। বুধবারের এই মর্মান্তিক ঘটনায় ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ১৭ জন বিদেশি নাগরিক ছিলেন।
 
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা পুলিশ কর্মীদের সঙ্গে মিলে হোটেল-কাম-গেস্টহাউসের ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদে বের করে আনতে সাহায্য করেন। তাঁরা বেশ কয়েকজন আহত ব্যক্তিকে সিপিআর (কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন) বা হৃদস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে প্রয়োগ করা জরুরি জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাও দেন। তাঁদের দ্রুত ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়া থেকেও রোধ করা সম্ভব হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জ্বলন্ত ভবনটি থেকে প্রায় ৪০ জনকে উদ্ধার করা হয়। এই তরুণদের সাহসিকতা ও নিঃস্বার্থ সেবার প্রশংসা করেন দিল্লি বিজেপি নেতা সতীশ উপাধ্যায়। তিনি প্রকাশ্যে আফজল, মহম্মদ শাহরুখ, মহম্মদ আনিস, মহম্মদ আমির এবং মহম্মদ ওয়াসিমের নাম উল্লেখ করে তাঁদের কৃতিত্বের স্বীকৃতি দেন। পাশাপাশি উদ্ধারকাজে অসাধারণ ভূমিকার জন্য দিল্লি পুলিশের পাঁচ কর্মী, হেড কনস্টেবল দিনেশ, কর্তার সিং, দেশরাজ, অজয় এবং মীনারও প্রশংসা করেন।
 
উপাধ্যায় জানান, তিনি তাঁদের নাম সম্মাননার জন্য পুলিশ কমিশনারের কাছে সুপারিশ করবেন। স্থানীয় উদ্ধারকারীদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি তাঁদের সাহস ও মানবিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “আমি তোমাদের জন্য গর্বিত। সিপিআর প্রদান এবং উদ্ধারকাজে সহায়তা করে তোমরা বহু মানুষের জীবন বাঁচিয়েছ, যার মধ্যে বিদেশি নাগরিকেরাও রয়েছেন।”
 
উদ্ধারকারীদের মধ্যে ছিলেন ওয়াসিম রাজা। তিনি জানান, কীভাবে তিনি এবং তাঁর বন্ধু শোয়েব ও ইসরার আগুনে আটকে পড়া মানুষদের সাহায্য করতে ছুটে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “আমরা কাছের একটি দোকান থেকে গদি এনে মাটিতে বিছিয়ে দিয়েছিলাম, যাতে মানুষ দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা থেকে লাফ দিতে পারে। এর ফলে অনেক মানুষের প্রাণ রক্ষা হয়েছে।”
হাউজ রানি গ্রামের বাসিন্দা এই তরুণদের সাহসিকতার জন্য সর্বত্র প্রশংসা করা হচ্ছে। সংকটের মুহূর্তে সব বিভেদ ভুলে মানবতা যে সর্বোচ্চ স্থান পায়, তাঁদের কর্মকাণ্ড তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
 
দক্ষিণ দিল্লির ঘনবসতিপূর্ণ হাউজ রানি এলাকায় অবস্থিত ‘ফ্লারিশ স্টে’ নামের একটি বেড-অ্যান্ড-ব্রেকফাস্ট হোটেলে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১১ জন বিদেশি নাগরিক ছিলেন। মৃতদের অনেকেই মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের বাসিন্দা।
 
হোটেলটিতে মূলত নিকটবর্তী ম্যাক্স হাসপাতালের রোগী এবং তাঁদের পরিজনেরা অবস্থান করতেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই ঘটনায় ৩৫ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৯ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং দিল্লির বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
 
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুন দ্রুত বহুতল ভবনটিকে গ্রাস করে ফেলে। প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টায় অনেকেই ওপরের তলা থেকে নিচে ঝাঁপ দিতে বাধ্য হন।
স্থানীয় বাসিন্দা শের খান বলেন, প্রথমে আগুন তেমন ভয়াবহ মনে না হলেও খুব দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তিনি ANI-কে বলেন, “আমি একটি দোকানের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন একটি ছোট আগুন দেখতে পাই। মুহূর্তের মধ্যে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের বেরিয়ে আসার কোনো উপায় ছিল না। মানুষ মাটিতে গদি বিছিয়ে দেয়, আর কয়েকজন তৃতীয় তলা থেকে ঝাঁপ দেন। তাঁদের মধ্যে একজনের কোলে একটি ছোট শিশুও ছিল। এক মহিলার পা ভেঙে যায়। সাধারণ মানুষ সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল সাহায্য করার, কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল।”
 
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা ওম সেই ভয়াবহ দৃশ্যের কথা স্মরণ করে বলেন, “সকাল প্রায় সাড়ে ৯টার সময় আমরা বিশাল আগুন দেখতে পাই। আমি এবং আমার বন্ধু স্কুটারে করে যাচ্ছিলাম। পুরো ভবনটি আগুনে ঘেরা ছিল এবং মানুষ বিভিন্ন দিক থেকে লাফ দিচ্ছিল। আমরা অন্তত পাঁচজনকে ঝাঁপ দিতে দেখেছি। তাঁদের মধ্যে একজনের পা ভেঙে গিয়েছিল বলে মনে হয়। রাস্তা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং বিশাল জনসমাগম হয়েছিল।” দিল্লি পুলিশের মতে, মৃতদের মধ্যে ১৫ জনেরও বেশি বিদেশি নাগরিক ছিলেন। 
 

দক্ষিণ জেলার উপ-পুলিশ কমিশনার অনন্ত মিত্তল জানান, সকাল ৮টা ৪৮ মিনিটে ‘ফ্লারিশ স্টে’ বি অ্যান্ড বি-তে আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়। খবর পাওয়ার পরই পুলিশ এবং জরুরি পরিষেবার কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান।
 
তিনি আরও জানান, উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান কয়েক ঘণ্টা ধরে চলেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করা এবং আগুন লাগার কারণ তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট সমস্ত সংস্থা ঘটনাস্থলে মোতায়েন রয়েছে।