মেধার ডানায় আত্মনির্ভর ভারতের স্বপ্ন: নদিয়ার ছাত্র মৃন্ময়ের ঘরে তৈরি মাইক্রো টার্বোজেট ইঞ্জিনে জাতীয় স্তরে বাংলার গর্ব
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
গ্রামের মাটির ঘর, সীমিত সামর্থ্য, আর্থিক টানাপোড়েন, এই চেনা বাস্তবতাকেই অসাধারণ মেধা ও অদম্য জেদের জোরে বদলে দিল নদিয়ার এক কিশোর। শান্তিপুর থানার বাবলা গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা, রানাঘাট সেন্ট মেরি স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র মৃন্ময় সরকার নিজের বাড়িতেই তৈরি করেছে অত্যাধুনিক ‘মাইক্রো টার্বোজেট ইঞ্জিন’। বয়স মাত্র আঠারো, কিন্তু স্বপ্ন অনেক বড়, দেশকে প্রযুক্তিগতভাবে আত্মনির্ভর করে তোলা।
মৃন্ময়ের এই সাফল্য নিছক কোনও স্কুল প্রজেক্ট নয়; এটি এক তরুণ মনের দীর্ঘ চার বছরের নিরলস গবেষণা, সাহস, প্রযুক্তি-চর্চা এবং দেশপ্রেমের ফল। তার বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রাক্তন কর্মী। ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছ থেকে দেশসেবার শিক্ষা পেয়েছে মৃন্ময়। সেই সঙ্গে আকাশে ওড়া বিমান তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করত। বিশাল বিমান কীভাবে উড়ে, তার ইঞ্জিন কীভাবে কাজ করে, এই কৌতূহলই ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যায় এক বিরল গবেষণার পথে।
মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে শুরু হয় তার স্বপ্নযাত্রা। বই, ইন্টারনেট, বিজ্ঞানভিত্তিক নানা তথ্য ঘেঁটে সে বুঝতে পারে, বিমানের চালিকাশক্তির অন্যতম মূল প্রযুক্তি টার্বোজেট ইঞ্জিন। কিন্তু এমন প্রযুক্তি তৈরি করা তো দূরের কথা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করাই প্রায় অসম্ভব। বাজারে দাম অত্যন্ত বেশি, আর গ্রামের সাধারণ পরিবারের পক্ষে তা বহন করা কঠিন। তবু থামেনি মৃন্ময়। নিজেই বাড়িতে বসে তৈরি করতে শুরু করে ইঞ্জিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও কলকব্জা। স্থানীয়ভাবে যা পাওয়া গেছে, তা ব্যবহার করেছে। যেটুকু পাওয়া যায়নি, তার বিকল্প নিজেই উদ্ভাবন করেছে। শুধুমাত্র একটি বিশেষ ফুয়েল পাম্প ভারতে না পাওয়ায় সেটি বিদেশ থেকে আনাতে হয়েছে।
এই পুরো কাজের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিরাপত্তা। কারণ, টার্বোজেট প্রযুক্তির সামান্য ভুলও ভয়াবহ বিস্ফোরণ ডেকে আনতে পারে। কিন্তু ঝুঁকিকে সঙ্গী করেই এগিয়েছে মৃন্ময়। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ব্যর্থতা, ভুল সংশোধন, সব মিলিয়ে নিজের ঘরেই সে গড়ে তোলে কার্যকরী মাইক্রো টার্বোজেট ইঞ্জিন।
মৃন্ময়ের তৈরি এই ইঞ্জিনের বিশেষত্বও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এটি ড্রোন এবং ছোট বিমানে ব্যবহার করা যেতে পারে। রয়েছে দ্বিমুখী জ্বালানি ব্যবস্থা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ, দুই মাধ্যমেই চালানো সম্ভব। শুধু তাই নয়, বাজারে থাকা প্রচলিত প্রযুক্তির তুলনায় এর উৎপাদন খরচ অনেক কম। ফলে ভবিষ্যতে দেশীয় প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এটি সাশ্রয়ী বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের উদ্ভাবন ভারতীয় প্রতিরক্ষা, ড্রোন প্রযুক্তি এবং ক্ষুদ্র বিমান শিল্পে নতুন দিশা দেখাতে সক্ষম।
মৃন্ময়ের আবিষ্কার ইতিমধ্যেই জাতীয় স্তরে স্বীকৃতি পেয়েছে। গত বছর চেন্নাইয়ে আয়োজিত জাতীয় বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে সে প্রথম স্থান অধিকার করে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আগত প্রতিযোগী ও বিজ্ঞানীদের সামনে নিজের উদ্ভাবন তুলে ধরে তাক লাগিয়ে দেয় নদিয়ার এই কিশোর। বড় বড় বিজ্ঞানীরাও তার প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও চিন্তাভাবনায় মুগ্ধ হন।
তবে মৃন্ময়ের কাছে এই সাফল্য শেষ নয়, বরং শুরু। ভবিষ্যতে সে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে আরও উন্নত দেশীয় প্রযুক্তি নির্মাণ করতে চায়। তার লক্ষ্য, বিদেশ থেকে ব্যয়বহুল প্রযুক্তি আমদানির বদলে ভারত যেন নিজেই উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে।
ছেলের সাফল্যে গর্বিত মা শুক্লা সরকার বলেন, “ও ছোট থেকেই দেশকে নিয়ে ভাবে। আমাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা ছিল, কিন্তু ওর স্বপ্ন থামাইনি। ও চায়, ভারত যেন নিজের প্রযুক্তিতে বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়।”
আজ মৃন্ময় সরকার শুধু নদিয়ার নয়, গোটা বাংলার গর্ব। তার গল্প প্রমাণ করে, সুযোগ সীমিত হতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন আর মেধার কোনও সীমানা নেই। এক সাধারণ গ্রামের ছেলে নিজের ঘরে বসে যে স্বপ্নের ইঞ্জিন তৈরি করতে পারে, তা ভবিষ্যতের ভারতকেও নতুন উচ্চতায় উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে।