নূরুল হক / আগরতলা
স্কুল জীবনে নাবালক বয়সে বাবাকে হারিয়েছিলেন। কলেজে উঠতেই হারান মাকে। অনাথ জীবনে টিকে থাকতে কখনো রাজমিস্ত্রির সঙ্গে ইট সিমেন্ট টানতে হয়েছে ,কখনো আবার জীবন ঝুঁকি নিয়ে করেছেন ইলেকট্রিকের কাজ। কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিতে রাত জেগে করেছেন সিকিউরিটির ডিউটি। কঠিন প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে শিক্ষা শেষ করে সেই ছেলে আজকে যোগ্যতার মধ্য দিয়ে চাকরি পেয়েছেন ত্রিপুরা সরকারের শিক্ষা দপ্তরে স্নাতকোত্তর শিক্ষকের।
ত্রিপুরার সোনামুড়া মহকুমার প্রান্তিক গ্রাম ভবানীপুর বল্লভপুরের জালাল মিয়ার সাফল্যের গল্প তরুণ-তরুণীদের কাছে অনুপ্রেরণার জ্বলন্ত উদাহরণ। একসময়ে রাজমিস্ত্রি জালালের হলুদ খামে চাকরির অফার সহ সাফল্যের ছবি এখন নেটে দুনিয়ায় ভাইরাল। কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও কিভাবে নিজেকে অবিচল রেখে সাফল্য অর্জন করা যায় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত জালাল মিয়া। সম্প্রতি আগরতলা রবীন্দ্র ভবনে মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরে স্নাতকোত্তর শিক্ষকের অফার পাওয়ার পরই কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জালাল মিয়ার সাফল্য অর্জনের বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। বাহবা কুড়ায় নেট দুনিয়ায়। জালাল মিয়া ত্রিপুরা শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড পরিচালিত পরীক্ষার মাধ্যমে ত্রিপুরা সরকারের অধীনে স্নাতকোত্তর শিক্ষকের অফার পেয়েছেন। তিনি এখন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিষয়শিক্ষক।
জালাল মিয়া
জালাল মিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তার জীবনের কঠিন সংগ্রামের কথা। জালাল মিয়া বলেন ত্রিপুরার আন্তর্জাতিক সীমান্তের সবচেয়ে প্রান্তিক গ্রামের মধ্যে রয়েছে তার জন্ম গ্রাম ভবানীপুর বল্লভপুর। এই গ্রাম এখনো শিক্ষা-দীক্ষায় অনেকটা পিছিয়ে আছে। নেই কোন সরকারি চাকরি। প্রান্তিক গ্রাম হওয়াতে একটা বৃহৎ অংশ এখনো কৃষিকাজ, বর্ডার ব্যবসা সহ ধর্মীয়ভাবে নিজেদের আঁকড়ে ধরে রাখতে চান। এই গ্রাম থেকেই বড় হয়েছেন জালাল। সাত ভাই বোনের পরিবারে একমাত্র জালাল ছোট থেকেই শিক্ষাকে আঁগলে ধরে রেখে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে তাকে অনেক মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে।
জালাল মিয়ার বাবা প্রয়াত আলী হোসেন ছিলেন একজন কৃষক। কৃষি কাজ করে ছেলে -মেয়েদের পড়াশোনা করানো অনেকটাই কষ্টকর ছিল। তারপরও শিক্ষার প্রতি আবেগ ছিল আলী হোসেনের। তিনি চেষ্টা করেছিলেন ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার। অন্য ছেলেমেয়েরা শিক্ষায় তেমন আগ্রহী না থাকলেও জালাল শুরু থেকেই পড়াশোনার দিকে মনোযোগী ছিল। বাবা মা দুর্বল আর্থিক অবস্থানের মধ্যেও জালালের পড়াশোনা টিকিয়ে রাখেন। এর মধ্যেই বড় ভাইয়েরা বিয়ের পর আলাদা হয়ে যায়। বিয়ে হয়ে যায় বড় বোনেদের। পারিবারিক রেশন কার্ডও সবার আলাদা হয়ে যায়। জালাল মিয়ার সঙ্গে থাকেন তার মা বাবা। জালাল যখন দুর্লভপুর হাই স্কুলের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী তখনই তার বাবার মৃত্যু হয়। পরীক্ষার প্রাক মুহূর্তে তার উপর নেমে আসে নিজের এবং মায়ের পেটের দায়িত্ব। তখনই গ্রামের এক রাজমিস্ত্রি কাকার সাথে কাজে ছুটতে হয় জালালকে।

দৈনিক ২০০ টাকা বিনিময়ে ইট ,সিমেন্ট টানার হাজিরা কাজ শুরু করে জালাল। মাধ্যমিকে টেস্টের পর অন্য পরীক্ষার্থীরা যেখানে দিনভর পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকতেও সেই সময় জালালকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে রাজমিস্ত্রির কাজে। তারপরও মাধ্যমিক সে ৪৯ শতাংশ নম্বর নিয়ে পাস করে। পরবর্তী ধাপে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য ভর্তি হয় ভবানীপুর উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে। পড়াশুনা এবং দৈনিক হাজিরার কাজ সমান্তরালভাবে চালিয়ে যেতে হয় জালালকে। উচ্চ মাধ্যমিকের দুই বছর সে কখনো রাজমিস্ত্রির কাজ করেছে ,কখনো কাজ করেছে ইলেকট্রিকের। সন্ধ্যার পর করতে হয়েছে টিউশনি। রাতে বিশ্রামের সময় জেগে থেকে করতে হয়েছে পড়াশোনা। কঠিন পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে ৭১ শতাংশ নম্বর পেয়ে প্রথম বিভাগে পাশ করে জালাল। তারপরে সে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে ভর্তি হয় সোনামুড়া কবি নজরুল মহাবিদ্যালয়। কলেজে ৮১ নম্বর পেয়ে জালাল স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করে। কলেজের পর রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করতে সে ভর্তি হয় সূর্যমনি নগর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই সময়ে সে আগরতলা নজরুল ছাত্রাবাসে আবাসিক ছাত্র ছিল। দুই বছরের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় এখানেও জীবন সংগ্রাম তাকে পিছু ছাড়েনি।
নজরুল ছাত্রাবাসে থাকাকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের রুটিন অনুযায়ী সে দিনে শ্রমিকের কাজ করতে পারত না। তাই তার রোজগারের পথ রীতিমতো বন্ধ হয়ে পড়ে। নজরুল ছাত্রাবাসের নিয়ম অনুযায়ী বৃত্তশালী ছাত্রছাত্রীদের সহায়তায় নিম্ন বৃত্তের ছাত্ররা দিনে কয়েক বেলা ফ্রিতে খাবার পায়। সেই ফ্রি খাবারে পেট ভরতে হতো জালালকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত খরচ এবং আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে সে হোস্টেলেই রাতে সিকিউরিটি কাজের দায়িত্ব নিয়ে নেয়। দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে সন্ধ্যায় কয়েকটা টিউশনি করত। আর রাত জেগে করতে হতো সিকিউরিটি গার্ডের কাজ। বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করার পর ত্রিপুরা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রায় ৯০ শতাংশ নম্বর নিয়ে দুই বছরের বি এড কোর্স শেষ করে।
এরপরে পরিশ্রমের পর্ব সামান্য শিথিল হয় জালাল মিঞার। কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলতার সঙ্গে বি এড শেষ করে সে কৃতি হিসাবে ত্রিপুরার কুমারঘাট বিএড কলেজে অতিথি অধ্যাপকের চাকরি পায়। অতিথি অধ্যাপনার কাজের পাশাপাশি ত্রিপুরা সরকারের শিক্ষা দপ্তর সহ বিভিন্ন দপ্তরে সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতি শুরু করে জালাল মিয়া। সেই প্রস্তুতির এক পর্ব শেষ হয়েছে চলতি বছরের মে মাসে। ত্রিপুরা সরকারের শিক্ষা দপ্তরে স্নাতকোত্তর শিক্ষক হিসেবে মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে অফার পেয়েছেন জালাল মিয়া। যদিও তার স্কুল পোস্টিং এখনো হয়নি। কিন্তু তারপরও সে এখন সরকারি শিক্ষক। আগরতলা রবীন্দ্র ভবনে হলুদ খামে অফার হাতে জালালের ছবি উঠে আসার পরই রাজমিস্ত্রি এক ছেলের সাফল্যের কাহিনী নেট দুনিয়ায় ভাইরাল।
জীবনের এই কঠিন সংগ্রামে তার মা-বাবা সহ শিক্ষক প্রবীর শীল এবং কয়েকজনের বিশেষ অবদান রয়েছে বলে জানিয়েছেন জালাল মিয়া। তিনি বলেন মা-বাবা মৃত্যুর আত্মীয়দের তেমন হাতছানি না থাকলেও অনেকে আমার শিক্ষা ক্ষেত্রে সহায়তা করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম শিক্ষক প্রবীর শীল। তিনি বিনা পয়সায় আমাকে টিউশন দিতেন। জালালের আগামী লক্ষ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি করা।
এই সাফল্য অর্জনের পর তিনি সমাজের প্রতি বার্তা দিতে গিয়ে বলেন 'দেশের প্রান্তিক সীমান্ত গ্রামে রোজগার এবং ধনী হওয়ার অনেক সহজ পদ্ধতি খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু যে সফলতায় পরিশ্রম কিংবা সংগ্রাম থাকে না তার কোন মূল্য নেই।' তিনি রাজ্যের গরিব ঘরের ছেলেমেয়ের সহ সীমান্ত গ্রামের ছেলেমেয়েদের বিশেষভাবে আহ্বান রেখেছেন সমস্ত অনৈতিক কাজ থেকে দূরে সরে শিক্ষা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাতে সফলতা অর্জনে সচেষ্ট হয়। উদ্দেশ্যে সঠিক থাকলে সফলতা একটু কঠিন হলেও অসম্ভব নয় বলে অভিমত স্নাতকোত্তর শিক্ষক জালাল মিঞার।