শতবর্ষের স্বাদে আজও অমলিন আমোদপুরের অনাথবন্ধু জেঠুর বোঁদে

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 15 h ago
পূর্ব বর্ধমান জেলার আমোদপুর গ্রামে রাজলক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার
পূর্ব বর্ধমান জেলার আমোদপুর গ্রামে রাজলক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

পূর্ব বর্ধমান জেলার আমোদপুর গ্রামে ঢুকলেই স্থানীয়দের মুখে একটি নাম বারবার শোনা যায়, অনাথবন্ধু জেঠুর মিষ্টির দোকান। সরকারি নাম ‘রাজলক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ হলেও গ্রামের মানুষের কাছে এটি যেন এক ঐতিহ্যের ঠিকানা। একশো বছরেরও বেশি পুরনো এই দোকান শুধু একটি ব্যবসা নয়, বরং একটি পরিবারের উত্তরাধিকার, একটি গ্রামের গর্ব এবং বাংলার হারিয়ে যেতে বসা খাদ্যঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল।
 
বর্তমান কর্ণধার ষাটোর্ধ্ব অনাথবন্ধু বাবুর কথায়, তাঁর দোকানের বয়স এখন প্রায় ১০৬ বছর। দাদুর হাতে শুরু হয়েছিল পথচলা, পরে দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাঁর বাবা। সেই ধারাবাহিকতায় আজও তিনি আগলে রেখেছেন শতবর্ষ প্রাচীন এক বিশেষ রেসিপি, যার জন্য দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন আমোদপুরে।
 

দোকানের পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু এক অনন্য মিষ্টি, বিউলির ডালের বোঁদে। নাম শুনতে পরিচিত হলেও এই বোঁদে সাধারণ বোঁদের মতো নয়। এর আকার আলাদা, উপকরণ আলাদা, আর স্বাদ তো একেবারেই স্বতন্ত্র। অনাথবন্ধু বাবুর দাবি, পশ্চিমবঙ্গের অন্য কোথাও এই রকম বোঁদে পাওয়া যায় না।
 
মাত্র তিনটি প্রধান উপকরণ, বিউলির ডাল, চালের গুঁড়ো এবং খাবার সোডা। এই সাধারণ উপকরণ দিয়েই তৈরি হয় অসাধারণ এক মিষ্টি। দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে মিশ্রণ প্রস্তুত করার পর তা গরম তেলে ভাজা হয়। তারপর চিনির শিরায় ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ব্যস, তৈরি হয়ে যায় সেই বিখ্যাত বোঁদে। তবে রেসিপি যতটা সহজ শোনায়, বাস্তবে কাজটি ততটাই শ্রমসাধ্য। কারণ, স্বাদের আসল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে মাপজোক, সময় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অর্জিত অভিজ্ঞতার মধ্যে।
 
ভাজার কাজ শুরু হতেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক অনন্য সুগন্ধ। স্থানীয়দের মতে, সেই গন্ধই বলে দেয় যে অনাথবন্ধু জেঠুর দোকানে আজ বোঁদে তৈরি হচ্ছে। ছোট থেকে বড়, গ্রামের মানুষ থেকে বাইরের অতিথি, সকলের কাছেই এই মিষ্টি সমান জনপ্রিয়।
 
দোকানে বিউলির ডালের বোঁদে বানানোর দৃশ্য
 
একসময় নিয়মিত বোঁদে তৈরি হলেও বয়সের ভারে এখন অনেকটাই কাজ কমিয়ে দিয়েছেন অনাথবন্ধু বাবু। তবুও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতি রবিবার সকাল আটটা থেকে তাঁর দোকানে পাওয়া যায় এই বিশেষ মিষ্টি। এছাড়া দুর্গাপুজো, কালীপুজো, অন্নপ্রাশন, বিয়ে বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য আগাম অর্ডার নিলে তিনি এখনও বোঁদে তৈরি করে দেন। তবে কাজের পরিমাণ ও পরিশ্রমের কথা মাথায় রেখে ন্যূনতম দেড় কেজি অর্ডার নিতে হয়।
 
শুধু আমোদপুর বা পূর্ব বর্ধমান নয়, জেলার বাইরে থেকেও বহু মানুষ ফোন করে বা সরাসরি এসে অর্ডার দেন। প্রয়োজন হলে ডেলিভারির ব্যবস্থাও করেন তিনি। তবে সবচেয়ে বড় কথা, এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও রেসিপিতে কোনও পরিবর্তন আনেননি। আধুনিক যন্ত্রপাতি বা শর্টকাট পদ্ধতির বদলে এখনও অনুসরণ করা হয় পূর্বপুরুষদের শেখানো পুরনো কায়দা।
 
এলাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের অনেকেই স্মৃতিচারণ করে বলেন, তাঁদের শৈশবে যে স্বাদের বোঁদে খেয়েছেন, আজও সেই একই স্বাদ পাওয়া যায় অনাথবন্ধু জেঠুর দোকানে। সময় বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, কিন্তু এই মিষ্টির স্বাদ যেন বদলাতে শেখেনি।
 
রাজলক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার
 
আজ যখন বাংলার বহু প্রাচীন খাদ্যসংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার মুখে, তখন আমাদপুরের রাজলক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। শতবর্ষেরও বেশি পুরনো একটি রেসিপিকে শুধু সংরক্ষণই নয়, সম্মানের সঙ্গে আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্বও পালন করছে এই পরিবার।
 
অনাথবন্ধু বাবুর আশা, তাঁর পরবর্তী প্রজন্মও এই ঐতিহ্য ধরে রাখবে। কারণ এই বোঁদে কেবল একটি মিষ্টি নয়; এটি একশো বছরের স্মৃতি, পরিশ্রম, সংস্কৃতি এবং বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক মধুর উত্তরাধিকার। আমোদপুরের ছোট্ট এই দোকান তাই আজও প্রমাণ করে, প্রকৃত স্বাদের কোনও বয়স হয় না।


শেহতীয়া খবৰ