মুন্নী বেগম / গুয়াহাটি
ঈদ-উল-আজহা বা বকরিদ কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি হলো ঐতিহ্য, সম্প্রীতি, অতিথি আপ্যায়ন এবং খাদ্য সংস্কৃতির এক বর্ণাঢ্য মিলনমেলা। এই উৎসবের মূল আকর্ষণ হলো কোরবানির আধ্যাত্মিক তাৎপর্য, যদিও এর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মাংসের ব্যঞ্জন এবং মিষ্টির সুবাসেও ঘরদোর আমোদিত হয়ে ওঠে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পাশাপাশি অসমেও বকরিদ উপলক্ষে বিশেষ খাদ্য প্রস্তুতের পরম্পরা বহু যুগ ধরে চলে আসছে। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং অতিথিদের একসঙ্গে বসিয়ে আপ্যায়ন করা এই উৎসবের অন্যতম সৌন্দর্য।
ঈদের নামাজ এবং কোরবানির পরই প্রতিটি মুসলিম পরিবারের রান্নাঘরে শুরু হয় ব্যস্ততা। কোরবানির মাংসের একটি অংশ দরিদ্র ও অভাবী মানুষদের দান করার পর বাকি অংশ দিয়ে প্রস্তুত করা হয় বিভিন্ন সুস্বাদু ব্যঞ্জন। এই পরম্পরা সমাজে সহানুভূতি, সমতা এবং সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা বহন করে।
বকরিদের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মাটন বিরিয়ানি। সুগন্ধি বাসমতি চাল, মসলা, ঘি, জাফরান এবং কোমল ছাগলের মাংসের টুকরো দিয়ে প্রস্তুত এই ব্যঞ্জন বহু পরিবারের ঈদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে। হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানির ঝাল এবং বিশেষ স্বাদ, কলকাতা বিরিয়ানির স্নিগ্ধ সুবাস অথবা অসমীয়ার মাটন পোলাও, প্রতিটি অঞ্চলই নিজেদের স্বতন্ত্র খাদ্য সংস্কৃতি বহন করে আসছে।
এছাড়াও মাটন কোরমা ঈদের খাদ্য তালিকায় বিশেষ স্থান দখল করে আছে। দই, কাজুবাদাম, পেঁয়াজ এবং বিভিন্ন মসলায় ধীরে ধীরে রান্না করা এই ব্যঞ্জন মোগলাই খাদ্য সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহন করে। নান, পরোটা বা পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করা কোরমা বহু খাদ্যপ্রেমীর প্রিয় খাবার। বহু অসমীয়া মুসলিম পরিবারে স্থানীয় বনৌষধি এবং আলু দিয়ে রান্না করা ঐতিহ্যবাহী ছাগলের মাংসের তরকারিও ঈদের সময় বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকে।
কাবাব ছাড়া যেন বকরিদের সন্ধ্যা অসম্পূর্ণ। শিক কাবাব, শামি কাবাব, বটি কাবাব ইত্যাদি সুস্বাদু ব্যঞ্জনগুলো প্রায়ই পারিবারিক সমাবেশ এবং সন্ধ্যার ভোজের সময় প্রস্তুত করা হয়। বহু পরিবারে পুরনো পারিবারিক রান্নার পদ্ধতি আজও যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা হয়, যা খাবারকে কেবল স্বাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে না, বরং ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরে।
ঈদ উদযাপনের সঙ্গে জড়িত একটি অনন্য সুস্বাদু খাবার হলো পায়া স্যুপ, যা মসলার সঙ্গে ছাগলের পা ব্যবহার করে ধীরে ধীরে কম আঁচে কয়েক ঘণ্টা ধরে রান্না করা হয়। স্বাদ এবং পুষ্টিতে সমৃদ্ধ এই খাবার ভারতের উত্তর এবং পূর্বাঞ্চলে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। একইভাবে বকরিদের সময় কলিজা ভাজা (লিভার ফ্রাই), ভেজা ফ্রাই (ব্রেইন ফ্রাই), নিহারি, ভুনা মাংস ইত্যাদি ব্যঞ্জনও খাদ্য তালিকায় বিশেষ স্থান পায়।
মাংসের ব্যঞ্জনের পাশাপাশি মিষ্টান্নগুলোও উৎসবের আনন্দ বাড়িয়ে তোলে। বিশেষ করে শির খুরমা বা সেমাই বকরিদের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুধ, সেমাই, খেজুর, কাজু, কিসমিস এবং অন্যান্য ড্রাই ফ্রুটসের মিশ্রণে প্রস্তুত এই মিষ্টান্ন অতিথি আপ্যায়নের অন্যতম প্রতীক। প্রায় প্রতিটি মুসলিম বাড়িতেই ঈদের দিনে অতিথিদের প্রথমে শির খুরমা পরিবেশন করার পরম্পরা রয়েছে।
ঈদের আরেকটি জনপ্রিয় ও প্রিয় মিষ্টি খাবার হলো ফিরনি। চালের গুঁড়ো, দুধ, এলাচ, জাফরান এবং গোলাপজল দিয়ে স্বাদযুক্ত ক্রিমি চালের পুডিং প্রস্তুত করা হয়। এটি মাটির পাত্রে ঠান্ডা করে পরিবেশন করা হয়, যা পুরনো উৎসবমুখর ঐতিহ্যের সঙ্গে এক নস্টালজিক সংযোগ বহন করে। শাহী টুকড়া ঈদের সমাবেশে উপভোগ করা এক রাজকীয় মিষ্টান্ন, যা ঘিতে ভাজা পাউরুটির টুকরো মিষ্টি দুধে ভিজিয়ে বাদাম দিয়ে সাজিয়ে প্রস্তুত করা হয়।
অসম এবং বঙ্গের বহু স্থানে মোগলাই মিষ্টির পাশাপাশি ঘরে তৈরি মিষ্টি যেমন পিঠা-লাড্ডু, পায়েস এবং হালুয়াও প্রস্তুত করা হয়। এই স্থানীয় সুস্বাদু খাবারগুলো ইসলামী উৎসবমুখর রীতি-নীতির সঙ্গে আঞ্চলিক ঐতিহ্যের সাংস্কৃতিক মিশ্রণকে সুন্দরভাবে প্রতিফলিত করে। এই ব্যঞ্জনগুলো সংরক্ষণে ঘরের মহিলারা প্রায়ই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যবাহী রান্নার পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষা দেন। ফলস্বরূপ খাবার কেবল আহার হয়ে থাকে না, বরং পারিবারিক সম্পর্ক এবং সংস্কৃতি সংরক্ষণের মাধ্যম হিসেবেও পরিগণিত হয়।
বকরিদের সময় খাবার কেবল স্বাদের বিষয় হয়ে থাকে না, বরং এটি আবেগিক এবং সাংস্কৃতিক তাৎপর্যও বহন করে। ব্যঞ্জনগুলো প্রায়ই দাদা-দিদার স্মৃতি, শৈশবের উদযাপন এবং সম্প্রদায়ের একসঙ্গে থাকার অনুভূতির সঙ্গে জড়িত থাকে। বহু পরিবার এখনও আসল স্বাদ বজায় রাখতে কাঠের আগুন, পাথরে বাটা মসলা এবং হাতে তৈরি মসলার মিশ্রণ ব্যবহার করা ঐতিহ্যবাহী রান্নার পদ্ধতি পছন্দ করে।
বকরিদের সময় খাবার ভাগাভাগি করে নেওয়া এই উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বহু পরিবারে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিবেশীদের বাড়িতে বিরিয়ানি, তরকারি, কাবাব এবং মিষ্টির প্লেট পাঠিয়ে সামাজিক সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক সম্মান আরও দৃঢ় করা হয়। গ্রাম এবং শহরে আয়োজিত সামূহিক ভোজ ঈদের সঙ্গে জড়িত ঐক্য এবং উদারতার মনোভাবকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।
আধুনিক সময়ে ফাস্টফুড এবং নতুন খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব বৃদ্ধি পেলেও বহু যুবপ্রজন্মকে আবারও ঐতিহ্যবাহী ঈদের খাবারের প্রতি আগ্রহী হতে দেখা যাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যম, খাদ্য উৎসব এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোও এই খাদ্য ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
প্রতীকী ছবি
সুতরাং বকরিদ কেবল একটি আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠানই নয়, এটি সমৃদ্ধ খাদ্য ঐতিহ্যেরও উদযাপন। বৈচিত্র্যময় মাংসের ব্যঞ্জন এবং মিষ্টি সুস্বাদু খাবারের মাধ্যমে এই উৎসব ঐতিহ্য সংরক্ষণ, পারিবারিক সম্পর্ক দৃঢ় করা এবং একসঙ্গে থাকার চিরন্তন সংস্কৃতিকে প্রসারিত করে চলেছে।