Story by Munni Begum | Posted by Aparna Das • 16 h ago
প্রতীকী ছবি
মুন্নী বেগম / গুয়াহাটি
খাদ্য চিরকালই এক সর্বজনীন ভাষা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। ধর্ম, সংস্কৃতি বা ভৌগোলিক ভিন্নতা যাই থাকুক না কেন, খাদ্য মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে রাখে। ঈদের সময় মুসলিম পরিবারগুলিতে নানা ধরনের সুস্বাদু পদ- শির খুরমা, ফিরনি, হালুয়া, শাহী টুকড়া, গুলাব জামুন, জিলাপি, বিরিয়ানি, পোলাও, কাবাব, চিকেন কোরমা, হালিম, নিহারি, মটন কারি প্রভৃতি, রান্না করা হয়। এই সব খাবারের সুবাসে ঘরদোর ও আশপাশের পরিবেশ ভরে ওঠে উৎসবের আনন্দে। তবে ঈদের খাবারের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু তার স্বাদে নয়, বরং তা ভাগ করে নেওয়ার মনোভাবেও নিহিত।
অনেক জায়গায় ঈদের সময় বিভিন্ন ধর্মের মানুষ মুসলিম পরিবারগুলির বাড়িতে যাতায়াত করেন, এটি একেবারেই সাধারণ দৃশ্য। হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান প্রতিবেশীরা তাঁদের মুসলিম বন্ধুদের ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে এবং সেই বিশেষ খাবারের স্বাদ নিতে তাঁদের বাড়িতে আসেন। বিশেষ করে শির খুরমা ও সেয়াইয়ের মতো মিষ্টির জন্য তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। অনেকের কাছে এই স্বাদ গ্রহণ যেন বছরে একবারের একটি আনন্দঘন প্রথায় পরিণত হয়েছে। এই উৎসাহই প্রমাণ করে, খাদ্য কীভাবে ধর্মের সীমারেখা অতিক্রম করে আপনত্ব ও মিলনের সেতুবন্ধন গড়ে তোলে।
এই প্রসঙ্গে গুয়াহাটি শহরের বাসিন্দা পাকিজা শইকীয়া ‘আওয়াজ-দ্য ভয়েস’-কে জানান, “মুসলিমদের রান্না করা সুস্বাদু খাবার শুধু একটি ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ নয়, বরং আজ তা বিশ্বব্যাপী এক সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। এই খাবারগুলির স্বাদ, সুগন্ধি মশলা এবং বিশেষ রান্নার পদ্ধতি সব ধর্মের মানুষের কাছেই এগুলিকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। অসম ও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিরিয়ানি, কাবাব, শির খুরমা, হালিম, নিহারি ইত্যাদি এখন সকলেরই প্রিয় খাবার। বিশেষ করে ঈদের সময় এদের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়।”
যখন অন্য ধর্মের অতিথিরা মুসলিম পরিবারের সঙ্গে বসে ঈদের খাবার উপভোগ করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই কথাবার্তা, হাসি এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার এক সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়। এই আন্তরিক পরিবেশে মানুষ একে অপরের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পান। এই আদান-প্রদান ভ্রান্ত ধারণা ও পক্ষপাত দূর করতে সাহায্য করে। একসঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়ার এই সহজ কাজটিই হৃদয়ের দুয়ার খুলে দেয় এবং বিশ্বাসের ভিত্তি মজবুত করে।
পাকিজা শইকীয়ার পরিবারে ঈদ উদযাপনের দৃশ্য
পাকিজা শইকীয়া আরও বলেন, “ঈদের খাবারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আতিথেয়তা। মুসলিম পরিবারগুলি প্রায় সারাদিন তাদের দরজা অতিথিদের জন্য খোলা রাখে। মিষ্টি, জলখাবার ও নানা পদ দিয়ে অতিথিদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। এই আন্তরিকতাই এমন এক পরিবেশ তৈরি করে যেখানে প্রত্যেকে নিজেকে সম্মানিত ও মূল্যবান বলে মনে করেন। এটি একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়, উৎসব মানুষকে বিভক্ত করে না, বরং একত্রিত করে।”
বহু সংস্কৃতির দেশ ভারতের মতো সমাজে ঈদের মতো উৎসবগুলি সামাজিক সম্প্রীতি দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন কোনো হিন্দু প্রতিবেশী আনন্দের সঙ্গে মুসলিম বাড়িতে খুরমার স্বাদ নেন, বা কোনো খ্রিস্টান বন্ধু ঈদের বিরিয়ানির প্রশংসা করেন, তখন ধর্মের বিভাজন যেন মিলিয়ে যায়। এই অভিজ্ঞতা শিশুদের মনেও গভীর প্রভাব ফেলে। তারা ছোটবেলা থেকেই শেখে পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা ও বন্ধুত্বের মূল্য।
শাহী টুকরা, নিহারি, বিরিয়ানি ও চিকেন কোরমা
পাকিজা আরও জানান, “ঈদের সময় আমাদের বাড়িতে অতিথিদের আসা-যাওয়া শুরু হয় রমজান মাস থেকেই। আমার সন্তানদের ও স্বামীর অমুসলিম বন্ধুরা ইফতারে যোগ দিতে খুবই উৎসাহিত থাকে। ঈদের সময়েও সেই একই উৎসাহ দেখা যায়। প্রতি বছর ঈদের পর প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আমাদের বাড়িতে অতিথিদের আনাগোনা চলতে থাকে। সবাই আমাকে চিকেন কোরমা, বিরিয়ানি আর শির খুরমা রান্না করার অনুরোধ করে।”
আজকের দিনে রেস্টুরেন্ট ও ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই সব খাবার সহজেই সকলের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে মুসলিম খাদ্য আর একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সবার প্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই বলা যায়, এই খাবারগুলি শুধু পেটই ভরায় না, বরং সমাজে ঐক্য, সহমর্মিতা ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে।
শামী কাবাব ও শির খুরমা
সুতরাং, ঈদ-উল-ফিতরের খাবার শুধু উৎসবের অংশ নয়, এটি একতা, উদারতা ও সহমর্মিতার প্রতীক। সকল ধর্মের মানুষের সঙ্গে খাবার ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়া সমাজের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। এই আতিথেয়তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবতা সব বিভেদের ঊর্ধ্বে।
এছাড়াও, ঈদ-উল-ফিতর আমাদের উদারতা ও দয়ার শিক্ষা দেয়। ঈদের নামাজের আগে মুসলিমরা যাকাত-উল-ফিতর প্রদান করেন, যাতে দরিদ্র মানুষও মর্যাদার সঙ্গে এই উৎসব উদযাপন করতে পারেন। অনেক পরিবার অতিরিক্ত খাবার প্রস্তুত করে তা প্রতিবেশী ও অভাবগ্রস্তদের মধ্যে বিলিয়ে দেন, ধর্মের ভেদাভেদ ছাড়িয়ে। এই মানবিক উদ্যোগ আমাদের শেখায়, সহানুভূতি কোনো ধর্মের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়, বরং তা মানবতারই এক অনন্য প্রকাশ।