বিশ্বের প্রথম মহিলা রিভার পাইলট রেশমা নিলোফার নাহা
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
সমুদ্রের প্রবল ঢেউ, সংকীর্ণ নদীপথ, প্রতিকূল স্রোত, কিছুই তাঁর অদম্য জেদকে থামাতে পারেনি।পুরুষশাসিত এক পেশার প্রথা ভেঙে ইতিহাস গড়েছেন রেশমা নিলোফার নাহা। তিনিই বিশ্বের প্রথম মহিলা রিভার পাইলট, যিনি নিজের দক্ষতা, সাহস ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছাশক্তির কাছে কোনও বাধাই চূড়ান্ত নয়।
চেন্নাইয়ের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম রেশমার। ছোটবেলা থেকেই তাঁর চোখে ছিল বড় স্বপ্ন। পড়াশোনায় মনোযোগী রেশমা স্কুলজীবন শেষ করে সামুদ্রিক প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করেন চেন্নাইয়ের নামী প্রতিষ্ঠান অ্যাকাডেমি অব মেরিটাইম এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং (AMET) থেকে। সেই পড়াশোনা শেষ করেই শুরু হয় তাঁর সমুদ্রযাত্রা। যাত্রীবাহী জাহাজ থেকে শুরু করে কনটেনার জাহাজ, বিশ্বের নানা প্রান্তে পাড়ি দিয়েছেন তিনি। প্রতিটি যাত্রাই তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে, আরও প্রস্তুত করেছে ভবিষ্যতের কঠিন চ্যালেঞ্জের জন্য।
রেশমা নিলোফার নাহা প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দের কাছ থেকে নারী শক্তি পুরস্কার গ্রহণ করছেন
দীর্ঘ সমুদ্রজীবনের অভিজ্ঞতার পর রেশমা প্রশিক্ষণ নেন কলকাতা বন্দরে (তৎকালীন কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট বা KoPT)। প্রায় সাড়ে ছয় বছর ধরে চলে সেই কঠোর প্রশিক্ষণ। অবশেষে ২০১৮ সালে তিনি কলকাতা বন্দরের পূর্ণকালীন মেরিটাইম পাইলট হিসেবে নিযুক্ত হন। সেই সঙ্গে ইতিহাসে লেখা হয় এক নতুন অধ্যায়, বিশ্বের প্রথম মহিলা রিভার পাইলট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন রেশমা নিলোফার নাহা।
নিজের কাজ সম্পর্কে রেশমা বলেন, “একজন মেরিন পাইলটের কাজ হল জাহাজকে নিরাপদে বন্দরের ভিতরে আনা এবং বাইরে নিয়ে যাওয়া। এই কাজের জন্য অসাধারণ শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রয়োজন। যখন আপনি প্রথম কেউ হন, তখন কাজটা আরও কঠিন হয়ে যায়।”
রেশমা নিলোফার নাহা
শুরুতে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন তাঁকে। অনেকের ধারণা ছিল, কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি এই পেশা ছেড়ে দেবেন। কিন্তু সমস্ত সংশয়কে ভুল প্রমাণ করে আজও তিনি দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন।
রিভার পাইলট হিসেবে তাঁর কাজের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রেশমা বলেন, “আমরা একটি নির্দিষ্ট বন্দরের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় বিশেষজ্ঞ ন্যাভিগেটর। আমরা জাহাজকে যেমন চিনি, তেমনই চিনি বন্দরের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পথ। কোনও জাহাজের ক্যাপ্টেন সব বন্দরের বিশেষজ্ঞ হতে পারেন না। তাই মেরিন পাইলটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
রেশমা নিলোফার নাহা
নদীপথে জাহাজ চালানো সমুদ্রের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। সংকীর্ণ নদী, অসংখ্য বালুচর, তীক্ষ্ণ বাঁক ও বিপজ্জনক স্রোত, সব মিলিয়ে প্রতিটি মুহূর্তে থাকে ঝুঁকি। রেশমার কথায়, “এক সেকেন্ডের ভুল সিদ্ধান্ত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই মানসিকভাবে সবসময় সতর্ক থাকতে হয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হয়।”
এই পেশায় শারীরিক সক্ষমতাও অত্যন্ত জরুরি। পাইলট লঞ্চার বা ছোট নৌকা থেকে দড়ির সিঁড়ি বেয়ে জাহাজে ওঠানামা করতে হয়, যা যথেষ্ট শক্তি ও ফিটনেস দাবি করে। দীর্ঘ সময় কাজ, পরিবারের থেকে দূরে থাকা আর উত্তাল সমুদ্রের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই, সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয়েছে রেশমা নিলোফার নাহার অদম্য চরিত্র।
নারী শক্তির প্রতীক হিসেবে তিনি পেয়েছেন ‘নারী শক্তি পুরস্কার’। কিন্তু পুরস্কারের থেকেও বড় তাঁর প্রেরণা। নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে তিনি আজ অসংখ্য তরুণীকে দেখাচ্ছেন নতুন পথ। প্রমাণ করছেন, সাহস থাকলে, স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা থাকলে, কোনও সমুদ্রই এত গভীর নয়, কোনও নদীপথই এত সংকীর্ণ নয়, যা একজন নারীকে থামিয়ে দিতে পারে।