আওয়াজ-দ্য ভয়েস
ফিটনেসের জগতে মিলিন্দ সোমান এক অত্যন্ত পরিচিত এবং অনুপ্রেরণাদায়ক নাম। শারীরিক সুস্থতা ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনের জন্য পরিচিত এই ৬০ বছর বয়সী অভিনেতা-সুপারমডেল বুধবার (১৮ মার্চ) World Pulse Summit-এ অনুষ্ঠিত একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনায় নিজের খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম এবং জীবনধারা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রকাশ করেছেন।
তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, সুস্থ জীবনের মূল চাবিকাঠি হলো সচেতনতা (mindfulness) এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, যা আজকের আধুনিক জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, তিনি “চিট মিল”-এর ধারণায় বিশ্বাস করেন না। খাবারের লোভের সঙ্গে লড়াই করতে হয় কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, তিনি যথেষ্ট সচেতন এবং যা নিজের জন্য সঠিক বলে মনে করেন, সেটাই বেছে নেন।
মিলিন্দ সোমান তাঁর মা ও স্ত্রীর সঙ্গে
এই প্রসঙ্গে মিলিন্দ বলেন, সচেতনতার মূলমন্ত্র হলো, আপনি কী করছেন, কেন করছেন এবং তা আপনাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, এই বিষয়গুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা।
তিনি বলেন, “আপনি সচেতন হন কারণ আপনি একটি নির্দিষ্ট দিকে এগোতে চান। আপনি অসচেতনভাবে সচেতন হতে পারেন না, তাই না? আপনি কী ভাবছেন, কী করছেন, তা আপনি খুব ভালোভাবেই জানেন। আপনি জানেন আপনি কেন এটি করছেন। তাই শেষ পর্যন্ত এটি স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়।”
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বিরিয়ানির মতো খাবারের প্রতি আমাদের আকর্ষণ সবসময় ক্ষুধার জন্য নয়, অনেক সময় এটি আবেগের প্রতিক্রিয়া। অর্থাৎ, এটি প্রকৃত প্রয়োজনের চেয়ে আবেগকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, মন ও শরীরের মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, “কোনো লোভ নেই। আপনি, আপনার মন এবং আপনার শরীর একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করে। যখন এই সংযোগ ভেঙে যায়, তখনই আপনি ভুল সিদ্ধান্ত নেন। আপনি বলেন, আজ আমাকে বিরিয়ানি খেতেই হবে। কেন? আপনার শরীরের কি সত্যিই বিরিয়ানি দরকার? না, একেবারেই না।”
তিনি বলেন, “আপনি শুধু আবেগের কারণে এটি খেতে চান। হয়তো আপনি ক্ষুধার্তও নন। আমি বলব, আমাদের সমাজে অনেকেই কখনো প্রকৃত ক্ষুধা অনুভবই করেননি।”
মিলিন্দ সোমান তাঁর ব্যক্তিগত রুটিন সম্পর্কে জানিয়ে বলেন, তিনি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করছেন। সাধারণত তিনি ১৬ ঘণ্টা উপবাস থাকেন এবং বাকি ৮ ঘণ্টার মধ্যে খাবার গ্রহণ করেন।
তিনি বলেন, “আমি ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং শুরু করেছি এবং এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি করছি। এটি আমার জীবনযাত্রায় অসাধারণ প্রভাব ফেলেছে। আমার শক্তি বেড়েছে, মনোযোগ বেড়েছে, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা উন্নত হয়েছে এবং আমি কম খাই। আমি বিশ্বাস করি নির্দিষ্ট সময়ে কম খাওয়া উচিত। তাই আমি প্রায় ১৬ ঘণ্টা কিছু খাই না এবং বাকি ৮ ঘণ্টায় খাই, আর তখন যা ইচ্ছে তাই খাই।”
মিলিন্দ সোমান
মিলিন্দ সোমান বলেন, “তবে আমি জানি কী খেতে হবে এবং কতটা খেতে হবে। আমাকে এ নিয়ে ভাবতে হয় না। যেমন ধরুন, যদি টেবিলে চিংড়ি আর গুলাব জামুন থাকে, তাহলে আমি চিংড়িই বেছে নেব, কারণ আমি চিনি কমাতে চাই।”
তিনি উল্লেখ করেন, ৪০ ও ৫০ বছর বয়সী অনেক মানুষ বহু বছরের অবহেলা ও ভুল খাদ্যাভ্যাসের কারণে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন।
শৈশবের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তিনি খাদ্যের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মের মধ্যে বড় হয়েছেন। পরিবারের স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের কারণে তিনি ২৩ বছর বয়স পর্যন্ত কোনো ঠান্ডা পানীয় পান করেননি। এই প্রাথমিক পরিবেশই তাঁর সারাজীবনের অভ্যাস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তিনি বলেন, “আপনি দেখবেন অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের ঠান্ডা পানীয়, চিনি-যুক্ত পানীয়, পিজ্জা, বার্গার খাওয়াচ্ছেন। আমি ২৩ বছর বয়স পর্যন্ত কখনো ঠান্ডা পানীয় খাইনি। ২৩ বছর পর্যন্ত বাইরে খাওয়াও হয়নি, কারণ আমার বাবা-মা এগুলোকে স্বাস্থ্যকর মনে করতেন না। আমার বাবা ছিলেন একজন পারমাণবিক বিজ্ঞানী, মা ছিলেন একজন জৈব রসায়নবিদ। আমার দাদা-দিদা চারজনই চিকিৎসক ছিলেন। তাই তারা জানতেন কোনটা ভালো, আর কোনটা নয়। কারণ ছোটবেলায় যা শেখা হয়, সেটাই পরে অভ্যাসে পরিণত হয়।”
এক ইতিবাচক আলোচনার শেষে মিলিন্দ বলেন, ভারতে দ্রুত হারে জনসংখ্যা বাড়ছে। “এটা দেখায় যে মানুষ সচেতন হচ্ছে। ভারতে খেলাধুলা, ফিটনেস বা ব্যায়ামের তেমন শক্তিশালী ঐতিহ্য না থাকলেও এখন সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে সচেতন হয়ে উঠছে।”