শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
পশ্চিমবাংলার মাটি বহু যুগ ধরেই ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ বহন করে চলেছে। বিশেষত ঈদের সময় সেই চিত্র যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—যেখানে হিন্দু ও মুসলমান ভেদাভেদ ভুলে একে অপরের আনন্দে শামিল হন।
কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আরিফ হোসেন জানালেন, “ঈদ মানেই শুধু নামাজ আর সেমাই নয়, ঈদ মানে আমাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। আমাদের বাড়িতে প্রতি বছর হিন্দু বন্ধুরা আসে, আমরা একসঙ্গে খাই, গল্প করি। এই মিলনটাই আসল উৎসব।”
অন্যদিকে, একই এলাকার বাসিন্দা সুমিতা চক্রবর্তী বললেন, “ছোটবেলা থেকেই দেখছি, ঈদের দিন আমরা নতুন জামা পরে আরিফদের বাড়ি যাই। খাওয়া-দাওয়া, হাসি-আড্ডা—সবকিছু মিলিয়ে এটা আমাদের নিজেদেরই একটা উৎসব। এখানে ধর্ম কোনো বাধা নয়, বরং সম্পর্কের সেতু।”
শুধু শহর নয়, গ্রামবাংলাতেও একই ছবি। হুগলির এক গ্রামের শিক্ষক রহিম শেখ জানালেন, “ঈদের সকালে নামাজ শেষে আমরা গ্রামের সব বাড়িতে মিষ্টি পাঠাই। হিন্দু প্রতিবেশীরাও আমাদের বাড়িতে আসে। দুর্গাপূজার সময় আমরা যেমন ওদের পাশে থাকি, তেমনই ঈদের সময় ওরাও আমাদের সঙ্গে থাকে।”
এই প্রসঙ্গে স্থানীয় সমাজকর্মী অনিরুদ্ধ দাস বলেন, “পশ্চিমবাংলার সংস্কৃতিতে এক ধরনের স্বাভাবিক সহাবস্থান রয়েছে। এখানে উৎসব মানেই সবার উৎসব। ঈদে যেমন হিন্দুরা অংশ নেয়, তেমনই পূজায় মুসলমানদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। এই পারস্পরিক অংশগ্রহণই সম্প্রীতির ভিত্তি।”
তবে বর্তমান সময়ে যখন বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক বিভাজনের খবর শোনা যায়, তখন পশ্চিমবাংলার এই চিত্র এক আশার আলো দেখায়। সমাজবিজ্ঞানী ড. শর্মিষ্ঠা সেনের মতে, “এই সম্প্রীতির মূল কারণ হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দীর্ঘদিনের সামাজিক বন্ধন। মানুষ এখানে একে অপরের সংস্কৃতিকে গ্রহণ করেছে, যা সহজে ভাঙার নয়।”
ঈদের বাজারেও এই মিলনের ছাপ স্পষ্ট। নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ী রাজেশ আগরওয়াল বললেন, “ঈদের আগে আমাদের দোকানে সব ধর্মের মানুষ কেনাকাটা করতে আসে। আমরা সবাইকে সমানভাবে স্বাগত জানাই। ব্যবসার বাইরেও এটা একটা সম্পর্কের জায়গা।”
সব মিলিয়ে বলা যায়, পশ্চিমবাংলায় ঈদ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি এক সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। এখানে হিন্দু-মুসলমান যেন একই বৃন্তের দুটি কুসুম—যারা একসঙ্গে ফুটে ওঠে, একসঙ্গে সুবাস ছড়ায়।
এই মিলনের বার্তাই আজকের সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। যেখানে বিভেদের দেয়াল ভেঙে গড়ে ওঠে ভালোবাসা, মৈত্রী ও সম্প্রীতির এক নতুন দিগন্ত।