যুদ্ধবিরতি ভেঙে ফের ইরানে মার্কিন হামলা, হরমুজ ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা; মার্কিন ড্রোন ভূপাতিতের দাবি তেহরানের
তেহরান/ওয়াশিংটন:
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও ফের সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ তুলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড়সড় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM)। পাল্টা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) দাবি করেছে, তারা একটি মার্কিন MQ-9 Reaper ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং যুদ্ধবিরতির সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে।
মার্কিন সেনাবাহিনীর দাবি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পরই এই সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। সেন্টকম জানিয়েছে, অভিযানে ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, উপকূলীয় রাডার, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং আইআরজিসির ৬০টিরও বেশি দ্রুতগতির নৌযান।
অন্যদিকে, আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহাবি দাবি করেছেন, বুশেহর প্রদেশের আকাশে ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি মার্কিন MQ-9 ড্রোনকে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুলি করে ভূপাতিত করেছে। তাঁর অভিযোগ, ড্রোনটি গোয়েন্দা নজরদারি ও সামরিক উদ্দেশ্যে ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল।
মার্কিন হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলেও সতর্কতা জারি হয়েছে। কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেলেও সেগুলির বেশিরভাগই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করার ফল বলে দাবি করা হয়েছে। নাগরিকদের সতর্ক থাকতে এবং প্রয়োজনে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কুয়েত সরকার।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পুনরায় স্বাভাবিকভাবে বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। যদিও দক্ষিণ ইরানের সিরিক, কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস এবং খার্গ দ্বীপে একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, কয়েকটি বেসামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সামরিক সদর দপ্তর মার্কিন হামলাকে "নির্লজ্জ আগ্রাসন" বলে আখ্যা দিয়ে কঠোর পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তাদের দাবি, যুদ্ধবিরতির পর স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক যুক্তরাষ্ট্র নিজেই লঙ্ঘন করেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একাধিক চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, হরমুজে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিরোধিতা, ইরানের তেল বিক্রির ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা, দক্ষিণ ইরানে হামলা এবং ভবিষ্যতে আরও সামরিক পদক্ষেপের হুমকি—সব মিলিয়ে শান্তি প্রক্রিয়া গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, তেলের দাম, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং নৌপরিবহনে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই নতুন সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
কূটনৈতিক মহলের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।