চতুর্থবার ব্রাজিলের মসনদে লুলা, জয় ঐতিহাসিক হলেও সামনে কঠিন পরীক্ষা! ঋণের বোঝা, রক্ষণশীল সংসদ ও রাজনৈতিক মেরুকরণই বড় চ্যালেঞ্জ
ব্রাজিল:
ব্রাজিলের রাজনীতিতে ফের ইতিহাস গড়লেন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা। ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে চতুর্থবারের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ২৫ অক্টোবরের নির্বাচনে লুলা পেয়েছেন ৫১.৭৯ শতাংশ বৈধ ভোট, আর ফ্লাভিওর প্রাপ্ত ভোট ৪৮.২১ শতাংশ। তবে এই জয় যতটা তাৎপর্যপূর্ণ, আগামী দিনের শাসনপর্ব তাঁর কাছে ততটাই কঠিন হতে পারে। অর্থনৈতিক চাপ, সংসদে বিরোধীদের শক্তি বৃদ্ধি এবং গভীর রাজনৈতিক বিভাজন—সব মিলিয়ে নতুন মেয়াদে বড় পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে লুলা।
লুলার এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি নির্বাচনী জয় নয়, ব্রাজিলের রাজনৈতিক লড়াইয়েরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে থাকার পরও চূড়ান্ত পর্বে জয় ছিনিয়ে নেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, সরাসরি জনসংযোগ এবং রাস্তায় সমর্থকদের সক্রিয়তা তাঁর প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোটার ফ্লাভিওকে সমর্থন করায় স্পষ্ট, দেশের রাজনৈতিক বিভাজন এখনও গভীর। ফলে শুধু নির্বাচনে জিতলেই হবে না, বিরোধী মতের মানুষের আস্থাও অর্জন করতে হবে লুলাকে।
নতুন সরকারের সামনে অন্যতম বড় বাধা হতে পারে ব্রাজিলের কংগ্রেস। দেশটির গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে রক্ষণশীল আইনসভাগুলির মধ্যে অন্যতম একটি গড়ে উঠেছে বলে বিশ্লেষকদের মত। ফ্লাভিও বলসোনারোর লিবারেল পার্টি ও তার সহযোগীদের শক্তিশালী উপস্থিতি আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে লুলার জন্য বাধা তৈরি করতে পারে। ফলে কল্যাণমূলক প্রকল্প বা অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতা জরুরি হয়ে উঠবে।
নতুন মেয়াদে লুলার সামনে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলির একটি সরকারি ঋণ। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রাজিলের সরকারি ঋণ দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ৮২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। উচ্চ সুদের হার সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় ৮ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ এবং ৯৩ লক্ষ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে সমস্যায় রয়েছে বলে ঋণ-তথ্য সংস্থা Serasa-র পরিসংখ্যানের উল্লেখ রয়েছে ।
এই পরিস্থিতিতে দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা এবং মূল্যস্ফীতির তুলনায় ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে লুলাকে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের লাগাম টানা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাও জরুরি। অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হবে তাঁর সরকারের বড় পরীক্ষা।
নির্বাচনী প্রচারে দেশের সার্বভৌমত্ব, শ্রমিকদের অধিকার এবং দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন লুলা। সরকারি সহায়তা প্রকল্পে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের উপর আর্থিক চাপ কমানোর প্রতিশ্রুতিও তাঁর প্রচারের অংশ ছিল। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতিগুলি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান এবং সংসদীয় সমর্থন জোগাড় করা সহজ হবে না।
লুলার নতুন মেয়াদ শুরু হবে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে। বয়সের ভার, বিরোধীদের রাজনৈতিক চাপ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে তাঁকে প্রশাসনিক দক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। নির্বাচনে সামান্য ব্যবধানে জয় পাওয়ায় জনসমর্থন ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিরোধী শিবিরের অভিযোগ ও রাজনৈতিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, লুলার সামনে এখন দ্বিমুখী দায়িত্ব—একদিকে দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ, অন্যদিকে ঋণ ও সরকারি ব্যয়ের চাপ সামলে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা। নির্বাচনী জয় তাঁকে আরও একবার ক্ষমতায় ফিরিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সেই জয়কে কতটা কার্যকর শাসনে রূপান্তরিত করতে পারেন তাঁর উপর।