জুলাই আন্দোলনের ফসলঃ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বিপাকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 d ago
জুলাই আন্দোলনের ফসলঃ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বিপাকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব
জুলাই আন্দোলনের ফসলঃ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বিপাকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব
 
ঢাকা ঃ
 
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ ঘিরে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এবং জাতীয় নির্বাচনের ঠিক ৩ দিন আগে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি একটি বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, বিশ্লেষকদের মতে এর প্রভাব শুধু বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের নীতি-স্বাধীনতা ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসরকে উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করতে পারে।

প্রথম দৃষ্টিতে চুক্তিটি  সাধারণ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির মতো মনে হলেও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর নানা গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রভাব বিস্তার করছে। এর মধ্যে রয়েছে আমদানি ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল নীতি, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা এবং তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ কৌশলগত সম্পর্ক গঠনের স্বাধীনতা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এটি আদৌ কেবল একটি বাণিজ্য চুক্তি, নাকি এর মাধ্যমে আরও বিস্তৃত প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে।
চুক্তিতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন খাতে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক স্বীকৃতি, লাইসেন্সিং ব্যবস্থার ওপর প্রভাব, কৃষিখাতে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, ডিজিটাল তথ্য ও নীতিতে প্রভাব এবং নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সহযোগিতা। অন্যদিকে, এসব পরিবর্তনের মূল চাপ বহন করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত ধারা। সেখানে বলা হয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র মনে করে বাংলাদেশ চুক্তির শর্ত মানছে না, তাহলে তারা আলোচনা চাইতে পারে এবং প্রয়োজনে আবারও শুল্ক আরোপ করতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে এটি দুই পক্ষের জন্যই প্রযোজ্য হলেও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব অনেক বেশি হওয়ায় এই ক্ষমতা একতরফা চাপ হিসেবে কাজ করতে পারে। চুক্তির কিছু ধারা সরাসরি বাংলাদেশের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলবে।  যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বাংলাদেশকেও তা সমর্থন করে অনুরূপ পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত ধারাগুলোতে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলার কথা বলা হয়েছে। এমনকি এমন লেনদেন থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আইনে নিষিদ্ধ।  দেশের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট একটি ধারাকে ঘিরে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর বা জ্বালানি কিনতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি বাণিজ্য চুক্তির সীমা ছাড়িয়ে সরাসরি কৌশলগত খাতে হস্তক্ষেপের শামিল।

চুক্তিটি জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে স্বাক্ষর হওয়ায় এর স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দাবি করেছিলেন, এটি গোপনে হয়নি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মতি নিয়েই চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তি নিয়ে জনপরিসরে পর্যাপ্ত আলোচনা বা স্বচ্ছতা ছিল না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন একটি চুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনমতের প্রতিফলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর প্রভাব শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও পড়তে পারে।