নেপালে ‘জেন জেড’ ঝড়: তরুণ প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহের নতুন সরকারে বদলের বার্তা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 2 h ago
নেপালে ‘জেন জেড’ ঝড়: তরুণ প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহের নতুন সরকারে বদলের বার্তা
নেপালে ‘জেন জেড’ ঝড়: তরুণ প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহের নতুন সরকারে বদলের বার্তা
 
বিদুষী গৌর / নয়াদিল্লি

রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্রের পথে এগোনো নেপাল এবার আরও এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী। বহুদিনের প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তিকে পিছনে ফেলে জনপ্রিয় র‍্যাপার ও তরুণ নেতা বালেন্দ্র শাহ দেশের নেতৃত্বে উঠে এসেছেন। বিশ্বের অন্যতম কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীদের একজন হিসেবে তিনি এখন এমন এক মন্ত্রিসভা গড়েছেন, যেখানে তাঁর মন্ত্রিসভাতেও রয়েছেন সমানভাবে ব্যতিক্রমী পরিচয়ের ব্যক্তিত্বরা, যারা হিমালয় দেশের তরুণ প্রজন্ম-জেন জেডের (Gen-Z) আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করছেন। 
 
শুরুতেই বলা যায়, রাষ্ট্রিয় স্বাধীনতা পার্টির নেতা বালেন শাহ একজন প্রশিক্ষিত স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার এবং কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র। তাঁর মন্ত্রিসভা ইতিমধ্যেই আলোচনায় এসেছে তরুণ মুখ, পেশাগত দক্ষতা এবং বহুমুখী সামাজিক পটভূমির জন্য।
 
 
প্রচলিত মন্ত্রিসভাগুলির মতো শুধুই পেশাদার রাজনীতিকদের আধিপত্য নয়, বালেন শাহের মন্ত্রিসভা এক নতুন মডেল তুলে ধরেছে, প্রযুক্তিবিদ, পেশাজীবী, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, যুবনেতা এবং সংস্কারপন্থী জননেতাদের সমন্বয়। বিভিন্ন অঞ্চল, সম্প্রদায় ও পেশাগত ক্ষেত্র থেকে সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই সরকার আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
 
প্রধানমন্ত্রী নিজেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দায়িত্বও রেখেছেন। স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে শিক্ষিত বালেন শাহ পরে সঙ্গীত জগতে প্রবেশ করেন এবং তারপর রাজনীতিতে আসেন। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার থেকে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়া মেয়র, সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর এই যাত্রা পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোর বিকল্প খুঁজতে থাকা তরুণ নেপালিদের অনুপ্রাণিত করেছে।
 
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ
 
অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে মন্ত্রিসভার অন্যতম উচ্চশিক্ষিত সদস্য হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে অভিজ্ঞ এই অর্থনীতিবিদ জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন এবং নেপালের অর্থনৈতিক সংস্কার আলোচনায় সক্রিয় ছিলেন। তাঁর উপস্থিতি বাজারে এই বার্তা দিয়েছে যে তরুণ সরকার অর্থনৈতিক দক্ষতাকেও সমান গুরুত্ব দেবে।
 
অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে
 
বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল নতুন প্রজন্মের নীতিনির্ভর নেতৃত্বের প্রতীক। সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য পরিচিত খানালকে ভারত ও চিনের মধ্যে নেপালের সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
 
বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল
 
জ্বালানি, জলসম্পদ ও সেচমন্ত্রী বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠ উন্নয়ন ও জনপরিষেবা ক্ষেত্রের পেশাগত অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছেন। জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ নেপালে তাঁর মন্ত্রক অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অন্তর্ভুক্তি দেখায়, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাস্তবমুখী শাসন ব্যবস্থার ওপর সরকারের বিশেষ জোর রয়েছে।
 
জ্বালানি, জলসম্পদ ও সেচমন্ত্রী বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠ
 
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং নেপালের জাতিগত বৈচিত্র্য এবং প্রচলিত ক্ষমতার কেন্দ্রের বাইরে থাকা কণ্ঠস্বরকে সামনে এনেছেন। উদ্যমী ও সংস্কারমুখী এই ৩৮ বছর বয়সি নেতা একসময় রেডিও জকি ছিলেন, এখন তিনি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সমন্বয় ও আইনশৃঙ্খলা সংস্কারের দায়িত্বে।
 
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং
 
ভৌত অবকাঠামো ও পরিবহণমন্ত্রী সুনীল লামসাল দেশের অন্যতম দৃশ্যমান জনপরিষেবা খাতের দায়িত্বে রয়েছেন। সড়ক, সংযোগ ব্যবস্থা ও নগর অবকাঠামো নেপালের উন্নয়নের মূল ভিত্তি হওয়ায় তাঁর নিয়োগ সরকারের প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন ভাবনাকে স্পষ্ট করে।
 
ভৌত অবকাঠামো ও পরিবহণমন্ত্রী সুনীল লামসাল
 
আইন, বিচার ও সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী সোবিতা গৌতম মন্ত্রিসভার অন্যতম উজ্জ্বল তরুণী মুখ হিসেবে উঠে এসেছেন। শিক্ষিত, স্পষ্টভাষী ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় সোবিতা তরুণ নারীদের শাসন ব্যবস্থায় বাড়তে থাকা অংশগ্রহণের প্রতীক। তাঁর মন্ত্রক তাঁকে আইন সংস্কার ও সংসদ পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দিয়েছে।
 
আইন, বিচার ও সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী সোবিতা গৌতম
 
মহিলা, শিশু ও প্রবীণ নাগরিকমন্ত্রী সীতা বাদি সামাজিক প্রতিনিধিত্বের এমন এক দৃষ্টান্ত, যা আগের অনেক সরকারে অনুপস্থিত ছিল। তাঁর নিয়োগকে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও শ্রেণির অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
 
ফেডারেল অ্যাফেয়ার্স ও সাধারণ প্রশাসনমন্ত্রী প্রতিভা রাওয়ালও একজন উল্লেখযোগ্য নারী মুখ। আমলাতন্ত্র ও প্রাদেশিক সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা রাওয়াল দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান শিক্ষিত নারী নেতৃত্বের প্রতিফলন।
 
ফেডারেল অ্যাফেয়ার্স ও সাধারণ প্রশাসনমন্ত্রী প্রতিভা রাওয়াল
 
স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যামন্ত্রী নিশা মেহতা মন্ত্রিসভার অন্যতম পেশাগতভাবে উপযুক্ত নিয়োগ বলে বিবেচিত। মহামারির পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যখাতে নীতিগত বোঝাপড়া ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা দুটোই জরুরি, তাই তাঁর নির্বাচনকে অনেকেই স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি নয়াদিল্লির এইমসের প্রাক্তনী।
 
শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী সস্মিত পোখরেল সরকারের যুবমুখী সংস্কার শিবিরের অংশ। শিক্ষা সংস্কার, প্রযুক্তি প্রবেশাধিকার ও কর্মসংস্থান, এই তিনটি ক্ষেত্র নেপালের ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
 
স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যামন্ত্রী নিশা মেহতা
 
যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী বিক্রম তিমিলসিনা নতুন সরকারের ডিজিটাল উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক। ডিজিটাল যুগের রাজনীতির মাধ্যমে উঠে আসা বালেন শাহের নেতৃত্বে এই মন্ত্রক আধুনিক রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ ও প্রযুক্তি পরিষেবা গড়ে তুলতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
 
কৃষি ও পশুপালনমন্ত্রী গীতা চৌধুরী দলটিতে আঞ্চলিক ও লিঙ্গ বৈচিত্র্য যোগ করেছেন। কৃষি এখনও বহু নেপালি পরিবারের জীবিকার মূল ভিত্তি, ফলে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
 
কৃষি ও পশুপালনমন্ত্রী গীতা চৌধুরী
 
শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী রামজি যাদব এবং শিল্পমন্ত্রী গৌরী কুমারী যাদবও মধেশি ও অন্যান্য বঞ্চিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকে সামনে এনেছেন। একইসঙ্গে তাঁদের ওপর চাকরি, শ্রম অভিবাসন ও শিল্প পুনরুজ্জীবনের দায়িত্ব রয়েছে।
 
এই মন্ত্রিসভাকে বিশেষ করে তুলেছে শুধু বয়স নয়, তাদের মানসিকতা। অনেকেই প্রচলিত ক্ষমতাধর রাজনীতিক নন, বরং শিক্ষিত পেশাজীবী। একাধিক নারী সদস্য রয়েছেন। অনেকেই প্রথম প্রজন্মের জাতীয় নেতা। তাঁরা একসঙ্গে নেপালের নতুন স্বপ্নের প্রতীক, বংশপরম্পরার বদলে যোগ্যতা, বক্তৃতার বদলে কাজ, স্থবিরতার বদলে তরুণ শক্তি।
 
 
তবে অনুন্নত এই দেশের সামনে বিপুল চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ফলে বালেন শাহের সামনে কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। পুরনো ব্যবস্থাকে ভেঙে যে জেন জেড সরকার উঠে এসেছে, তারা আদৌ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার।