“শূন্যের ভেতরেই স্বপ্ন: আফরিন বেগমের সহজ জীবন, কঠিন লড়াই”

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 4 h ago
বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে সিপিআইএম প্রার্থী আফরিন বেগম (শিল্পী)
বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে সিপিআইএম প্রার্থী আফরিন বেগম (শিল্পী)
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

কলকাতার ব্যস্ত নাগরিক জীবনের ভিড়ে এমন মানুষ খুব বেশি চোখে পড়ে না, যাঁদের জীবন এতটা সরল অথচ এতটাই স্পষ্ট। আফরিন বেগম তেমনই এক মুখ, যাঁর পরিচয় কোনও চাকচিক্য বা বাহুল্যে নয়, বরং স্বল্পতায় গড়ে ওঠা এক গভীর ব্যক্তিত্বে।
 
বয়স মাত্র ২৯। বেণীপুকুরের এক সাধারণ পরিবারে বড় হওয়া আফরিনের জীবনযাপন মধ্যবিত্তের চেনা ছকে বাঁধা, তবু সেই ছকের মধ্যেই রয়েছে কিছু আলাদা রেখা। তাঁর শিক্ষাজীবন কেটেছে Jadavpur University-এ, যেখানে শুধু পাঠ্যসূচি নয়, সমাজ-বাস্তবতা নিয়েও ভাবনার জগৎ তৈরি হয়। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে গড়ে তুলেছে একজন সংবেদনশীল ও সচেতন মানুষ হিসেবে।
 
বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে সিপিআইএম প্রার্থী আফরিন বেগম (শিল্পী)
 
আফরিনের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হল তাঁর সরলতা। আজকের দিনে যেখানে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয় সম্পত্তি, গাড়ি বা বিলাসবহুল জীবনযাপন, সেখানে আফরিন যেন একেবারেই উল্টো স্রোতে হাঁটছেন। তাঁর নিজের নামে নেই কোনও বাড়ি, জমি বা স্থাবর সম্পত্তি। এমনকি সোনাদানা বা মূল্যবান অলঙ্কারের তালিকাও ফাঁকা। যেন ইচ্ছে করেই তিনি নিজেকে এইসব বাহ্যিক চিহ্ন থেকে দূরে রেখেছেন।
 
তবে এই ‘শূন্যতা’ আসলে নিছক অভাব নয়, বরং এক ধরনের জীবনদর্শন। তাঁর কাছে জীবনের মূল্য নির্ধারিত হয় প্রয়োজন আর সংযমের ভারসাম্যে। হাতে নগদ থাকে মাত্র ৫০০ টাকা, এই তথ্য যেমন বিস্মিত করে, তেমনই তাঁর সঞ্চয়ের অভ্যাস আবার অন্য এক দিক তুলে ধরে। তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ধীরে ধীরে জমানো টাকায় তাঁর বিশ্বাস, হঠাৎ পাওয়া প্রাচুর্যে নয়।
 
এই ব্যাঙ্কগুলির মধ্যে রয়েছে State Bank of India-র একটি শাখা, যেখানে তাঁর নিয়মিত লেনদেন চলে। পাশাপাশি, ছোট পরিসরেই হলেও তিনি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেছেন, Bharat Electronics Limited, REC Limited এবং Indian Railway Finance Corporation-এর মতো সংস্থায়। এই বিনিয়োগ তাঁর আর্থিক সচেতনতার পরিচয় দেয়, যেখানে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও ভবিষ্যতের কথা ভাবা হয়।
 

নিজের নিরাপত্তার জন্য তিনি Life Insurance Corporation of India-তে একটি জীবন বিমা পলিসিও নিয়েছেন। তবে এইসব পরিকল্পনার বাইরে তাঁর জীবনে বিলাসিতা বলে কিছু নেই। কোনও ব্যক্তিগত গাড়ি নেই, নেই অযথা খরচের অভ্যাস। বরং সহজ, পরিমিত এবং নিয়ন্ত্রিত জীবনই তাঁর পছন্দ।
 
আফরিনের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হল তাঁর স্বচ্ছতা। তাঁর নামে কোনও ফৌজদারি মামলা নেই, এমনকি এমন কোনও আয়ও এখনও হয়নি যাতে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয়। কোনও ঋণ বা দায়ও নেই তাঁর ওপর। এই দিকগুলো মিলিয়ে তাঁকে একেবারে ‘পরিষ্কার’ এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরে।
 
তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মানুষের সঙ্গে তাঁর সংযোগ। বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতদের কাছে আফরিন এমন একজন, যিনি সহজে মিশে যান, শুনতে জানেন এবং নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন। তাঁর কথাবার্তায় নেই অহংকার, বরং রয়েছে একধরনের স্থিরতা।
 
আফরিন বেগমের জীবন যেন এক ধরনের প্রতিবাদও, যেখানে প্রমাণ হয়, বড় হয়ে ওঠার জন্য বড় সম্পদের প্রয়োজন নেই। বরং প্রয়োজন স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, সংযম এবং নিজের প্রতি সততা।
 
আজকের দিনে যখন ব্যক্তিগত ইমেজ অনেক সময়ই কৃত্রিমভাবে তৈরি হয়, তখন আফরিন সেই ভিড় থেকে আলাদা। তাঁর ইমেজ তৈরি হয়েছে তাঁর জীবনযাপন থেকেই, যেখানে নেই কোনও বাড়াবাড়ি, নেই কোনও অতিরঞ্জন। তিনি যেমন, ঠিক তেমনভাবেই নিজেকে সামনে আনেন।
 
সব মিলিয়ে, আফরিন বেগম একজন ‘অন্যরকম’ তরুণী, যাঁর জীবন হয়তো খুব সাধারণ, কিন্তু সেই সাধারণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসাধারণ এক স্বচ্ছতা। তাঁর গল্প মনে করিয়ে দেয়, শূন্য থেকেও একটি পূর্ণ জীবন গড়ে তোলা সম্ভব, যদি থাকে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি আর নিজের প্রতি অটল বিশ্বাস।