নয়াদিল্লি
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে তিস্তা-সহ একাধিক নদীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে নদী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত ১৩টি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মধ্যে তিস্তা নদী প্রকল্প অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। এই পদক্ষেপকে ঘিরে ভারতের কৌশলগত মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা নদীর জল ব্যবস্থাপনা শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের কাছেও অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ফলে এই ক্ষেত্রে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা ভবিষ্যতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তাঁর প্রথম বিদেশ সফর, আর প্রথম গন্তব্য হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন চীনকে। মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পর সেখান থেকে তিনি সরাসরি চীনের দালিয়ান শহরে পৌঁছান। পরে দ্রুতগতির ট্রেনে বেইজিং যান, যেখানে তাঁর চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং-সহ শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সফরের মাধ্যমে ঢাকা বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করার বার্তা দিয়েছে।
চীন দীর্ঘদিন ধরেই তিস্তা নদীর পুনরুদ্ধার ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়ে আসছিল। তবে শেখ হাসিনার সরকারের সময় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। এবার বাংলাদেশ সরকার সেই প্রকল্পে চীনের সরাসরি অংশগ্রহণের পথ খুলে দিয়েছে। বিশেষ তাৎপর্যের বিষয় হল, এই প্রকল্পটি ভারতের শিলিগুড়ি করিডরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত, যা 'চিকেন নেক' নামে পরিচিত এবং ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একমাত্র স্থল সংযোগ।
চীনের জলসম্পদ মন্ত্রী লি গুওইংয়ের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রতিবছর বন্যার ঝুঁকি কমাতে তিস্তা নদী প্রকল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা চায় বাংলাদেশ। পাশাপাশি নদীভাঙন রোধ এবং সেচ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রেও চীনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের এই প্রস্তাবে দ্রুত ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে চীন। বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে তিস্তার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, নদীপথ সংস্কার এবং ব্যারাজ নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে চীনা প্রকৌশলীরা অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। দালিয়ানে বিনিয়োগকারীদের এক বৈঠকে তারেক রহমান জানান, আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল থেকে পলি অপসারণ এবং পদ্মা ও তিস্তা নদীর জল ব্যবস্থাপনা উন্নত করার একটি কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ।
এই পরিস্থিতি ভারতের জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। তিস্তা নদী পূর্ব হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদীটি শিলিগুড়ি করিডরের খুব কাছ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এলাকাটি ভারতের নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এই করিডরই উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের একমাত্র স্থল যোগাযোগ রক্ষা করে। ফলে তিস্তা প্রকল্পের মাধ্যমে ওই এলাকায় চীনের উপস্থিতি বাড়লে তা ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে জলবণ্টন ইস্যুও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৪ সালে ভারত তিস্তা অববাহিকার জন্য প্রযুক্তিগত ও সংরক্ষণমূলক সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল সীমান্তবর্তী নদীগুলির যৌথ ব্যবস্থাপনায় ঢাকার সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সহযোগিতার পথ বেছে নিয়েছে।
এদিকে ১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে যে ৩০ বছরের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার মেয়াদ চলতি বছর শেষ হচ্ছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার জল বণ্টন নিয়ে হওয়া এই চুক্তি যদি নবীকরণ না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে জলবণ্টন নিয়ে নতুন করে মতবিরোধ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।