তরুণ নন্দী / কলকাতা
বাঙালির মেয়েদের ঐতিহ্য মানেই বারো হাত শাড়ি। এই শাড়ির কুঁচি আর আঁচলকে সঙ্গী করেই ফুটবল পায়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিলেন এক যুবতী। উত্তর ২৪ পরগনার গুমার এক অভাবী পরিবারের মেয়ে বিপাশা বৈষ্ণব যেন অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়ে দিয়েছেন। কাতার বিশ্বকাপের প্রচারমূলক ভিডিও থেকে শুরু করে ভারতীয় ফুটবল মহলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন শুধুই নাম বিপাশা বৈষ্ণবের।
বিপাশার এই সাফল্যের পথটা কিন্তু মোটেও মসৃণ ছিলনা। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে আর পাঁচটা মেয়ের মত বন্ধুদের সঙ্গে পুতুল খেলাতে তার আগ্রহ ছিলনা। ওই বয়সে বিপাশার চোখ আটকে থাকত পাড়ার ছেলেদের ফুটবল ম্যাচের দিকে। ফুটবল খেলার ইচ্ছে জানানো হয়েছিল বাড়িতে। কিন্তু মেয়ে হওয়ার কারণে মাঠে নামার অনুমতি মেলেনি।
মনের ভেতরের অদম্য ইচ্ছেটাকে কি সত্যিই খাঁচায় বন্দি করা যায় না, মেয়ের চোখের ভাষা দেখে অনুভব করেছিলেন দিনমজুর বাবা। অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা মেয়ের ইচ্ছেপূরণে হাতে তুলে দিয়েছিলেন একটা ফুটবল। আর সেই একটা বলকে আঁকড়ে শুরু হয়ে যায় এক সাধারণ ঘরের মেয়ের অসাধারণ স্বপ্নযাত্রা।
আজ বিশ্বজুড়ে ফুটবল জাগলিং-এ বিপাশা একটা নাম। ফুটবল জাগলিংয়ের জন্য প্রয়োজন আধুনিক পরিকাঠামো ও সরঞ্জাম কোনকিছুই ছিলনা এই মেয়েটির। অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠায় আধুনিক জিম বা ট্র্যাকিং গিয়ার কেনার সামর্থ্য ছিল না তাঁর। তাই বলে তাঁর অনুশীলন থেমে থাকেনি। ঘরের কোলবালিশ, বাতিল গাড়ির টায়ার, ভাঙা কাঠের চেয়ার, এইসব সাধারণ জিনিস দিয়েই বিপাশা বানিয়ে তুলেছিলেন তাঁর সাধনার অনুশীলন ক্ষেত্র।
বিপাশা বৈষ্ণব
মাথা, পা আর শরীরের অদ্ভুত ভারসাম্যে বলকে তিনি নাচিয়ে বেড়ান। যা দেখে দেশের তাবড় ফুটবলাররাও হাঁ হয়ে যান। কোচ সুব্রত রায়ের হাত ধরে বহু বছরের কঠোর পরিশ্রমে বিপাশা আজ নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অন্য উচ্চতায়। প্রিয় ছাত্রীর সাফল্য দেখে তাঁর প্রশিক্ষক দাবি করলেন, বিপাশা যা করে, তা ভারতবর্ষে আর কেউ পারে না।
কন্যাশ্রী কাপের ফাইনাল থেকে কলকাতার বড় বড় টুর্নামেন্টের উদ্বোধন, সবখানেই আজ বিপাশার পায়ের জাদু দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে ফুটবলপ্রেমীরা। জানা যায়, বিপাশার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে স্বয়ং ভারতের কিংবদন্তি ফুটবলার সুনীল ছেত্রী তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছেন। কাতার বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রোমো ভিডিওতে শাড়ি পরে বল পায়ে বিপাশাকে দেখা গিয়েছিল।
বিপাশা বৈষ্ণব কয়েকজন ব্যাক্তির সঙ্গে
বিপাশা মনে করেন, লক্ষ্যপূরণের জন্য পর্যাপ্ত দামি সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না। শুধুমাত্র প্রয়োজন হয় লক্ষ্যপূরণের অদম্য ইচ্ছা। পরিস্থিতি যেমনই হোক, নিজের শিকড়কে সম্মান জানিয়েও বিপাশা বৈষ্ণব আজ প্রতিটি বাঙালীর গর্ব। কারণ, তিনি প্রমাণ করেছেন পায়ের তলার মাটি শক্ত না হলেও মনের জোরে আকাশে ওড়া সম্ভব হয়।