রামমূর্তি ঘিরে উত্তাল বাংলাদেশ, ঢাকায় মশাল মিছিল ও ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনিতে সরব হিন্দু সমাজ

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 9 h ago
রামমূর্তি ঘিরে উত্তাল বাংলাদেশ, ঢাকায় মশাল মিছিল ও ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনিতে সরব হিন্দু সমাজ
রামমূর্তি ঘিরে উত্তাল বাংলাদেশ, ঢাকায় মশাল মিছিল ও ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনিতে সরব হিন্দু সমাজ
 
ঢাকা

ঢাকা ও উত্তর বাংলাদেশের একাধিক জেলায় নতুন করে ধর্মীয় উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়েছে। রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়িতে নির্মীয়মাণ ভগবান রামের বিশাল মূর্তিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত। মূর্তি নির্মাণের বিরোধিতার পাশাপাশি ভগবান রামের ছবির অবমাননার অভিযোগ ঘিরে ক্ষোভে ফুঁসছে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়। শুক্রবার ঢাকার রাজপথে মশাল মিছিল, মানববন্ধন এবং ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনিতে প্রতিবাদ জানালেন হাজার হাজার মানুষ।
 
হিন্দু সংগঠনগুলির অভিযোগ, চলতি মাসের শুরুতে গাইবান্ধায় একটি বিক্ষোভ কর্মসূচির সময় একদল ইসলামপন্থী উগ্রপন্থী ভগবান রামের ছবির উপর জুতো রেখে অবমাননা করে। ঘটনার পর মামলা দায়ের হলেও এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে অভিযোগ। এই ঘটনাকেই কেন্দ্র করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
শুক্রবার ঢাকার শাহবাগ মোড়ে জড়ো হন বিভিন্ন হিন্দু সংগঠনের সদস্য, ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ মানুষ। সেখান থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব পর্যন্ত মিছিল করা হয়। হিন্দু মহাজোটের ডাকে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান। একইসঙ্গে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনেরও আয়োজন করা হয়। অন্যদিকে, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (DRU) সামনেও পৃথক বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
 
রংপুরেও প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বিক্ষোভ মিছিলের অনুমতি না দেওয়ায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের বাগ্‌বিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
 
বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই এখনও পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এদিন আন্দোলনকারীরা ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্রেফতার না হলে আরও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। শনিবার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রকের কাছেও একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
 
একইসঙ্গে হিন্দু মহাজোটের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, যদি পলাশবাড়িতে রামমূর্তি নির্মাণের কাজ পুনরায় শুরু করার অনুমতি না দেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার প্রতিটিতেই ধাপে ধাপে রামমন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
 
এদিকে, বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা পলাশবাড়ির প্রকল্পটি ছিল বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় স্থাপত্য উদ্যোগ। শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ মন্দির কমিটির তত্ত্বাবধানে নির্মিত ৮১ ফুট উঁচু রামমূর্তির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় ২২ কোটি বাংলাদেশি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পে ৫০ ফুট উঁচু শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি এবং ৩০ ফুট উঁচু শিবমূর্তিও নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
 
মন্দির কমিটির সভাপতি হরিদাস চন্দ্র দাস জানিয়েছেন, ইসলামপন্থী সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে হুমকি আসার পরই নির্মাণকাজ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এমনকি এক উগ্র ইসলামি প্রচারক প্রকাশ্যে বুলডোজার দিয়ে মূর্তি ভেঙে ফেলার হুমকিও দিয়েছেন বলে অভিযোগ। ফলে নিরাপত্তাহীনতার কারণে কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা।
 
তবে মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থেই আপাতত কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। কোনওভাবেই সামাজিক অশান্তি বা ধর্মীয় বিরোধের কারণ হতে চায় না বলেও তারা স্পষ্ট করেছে।
 
বাংলাদেশে হিন্দুরা দেশের বৃহত্তম ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, যাদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশে অন্তত ১৩৩টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
 
যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছেন, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালন করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণেও তিনি বলেছিলেন, “ধর্ম ব্যক্তির জন্য, কিন্তু দেশ সবার।” তা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও ধর্মীয় সহাবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
 
পরিস্থিতির দিকে এখন নজর রয়েছে গোটা দেশের। শনিবার থেকে নতুন করে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে জাতীয় পূজা উদযাপন পরিষদ। ফলে রামমূর্তি বিতর্ককে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি আগামী দিনে আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।