রাশিয়ায় মুসলিম আলেমদের গ্রেফতার: আইনের প্রয়োগ নাকি বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষের ছায়া?

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 6 d ago
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
মস্কো: 

রাশিয়ায় একের পর এক মুসলিম ধর্মীয় নেতা, আলেম ও কমিউনিটি প্রতিনিধিদের গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, এসব ঘটনা দেশটিতে ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষ, অভিবাসীবিরোধী মনোভাব এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর রাজনৈতিক চাপের ইঙ্গিত বহন করছে। যদিও রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, সব গ্রেফতারই নির্দিষ্ট আইনি অভিযোগের ভিত্তিতে করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।

সম্প্রতি রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত আটজন মুসলিম আলেম ও কমিউনিটি নেতাকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কারেলিয়ার সাবেক মুফতি উইসাম বার্দভিল। শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরে পুলিশের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগে তাঁকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া তাঁর সহযোগী আখমাদ তাঙ্গিয়েভ, মর্দোভিয়ার মুফতি রয়াল আসেনভ এবং সেন্ট পিটার্সবার্গভিত্তিক মুসলিম সংগঠনের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ খেনিসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে তদন্ত চলছে।

রুশ তদন্ত সংস্থার ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, কয়েকজনের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ঘোষিত মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ আনা হয়েছে। রাশিয়া ২০০৩ সালে সংগঠনটিকে চরমপন্থি ও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

তবে সমালোচকদের মতে, অভিযোগের ধরন ও গ্রেফতারের ধারাবাহিকতা মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি নজরদারির ইঙ্গিত দেয়। তাঁদের প্রশ্ন, কেন একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম নেতারাই তদন্তের আওতায় আসছেন?

রাশিয়ার মুসলিমদের অন্যতম প্রধান সংগঠন স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস (ডিইউএম)-কে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি সংগঠনটির প্রথম উপপ্রধান দামির মুখেতদিনভ একটি ঐতিহাসিক চিত্রকর্ম প্রদর্শনের কারণে জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েন। চিত্রকর্মটিতে ১২২৩ সালের কালকা যুদ্ধের দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছিল, যা কট্টরপন্থীরা "রাশিয়াবিরোধী" বলে আখ্যা দেয়।

এর মধ্যেই আবাসিক ভবনে ধর্মীয় সমাবেশ ও জামাতে নামাজের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের একটি বিতর্কিত বিল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে রুশ পার্লামেন্টে। ডিইউএম প্রধান মুফতি রাভিল গাইনুতদিন সরাসরি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে আবেদন জানিয়ে সতর্ক করেছেন, এই আইন মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং সামাজিক বিভাজন আরও বাড়াতে পারে।পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, বিলটির বিরুদ্ধে মুসলিম নেতৃত্বের প্রকাশ্য অবস্থানের পরপরই আলেমদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হওয়া নিছক কাকতালীয় নাও হতে পারে।
 
বর্তমানে রাশিয়ায় প্রায় দুই কোটিরও বেশি মুসলিম বসবাস করেন, যা ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠী। দীর্ঘদিন ধরে ক্রেমলিন মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করলেও ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশটিতে অভিবাসীবিরোধী ও ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।রুশ সরকার বলছে, আইন সবার জন্য সমান এবং নিরাপত্তার স্বার্থেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, যদি ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযানের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে তা রাশিয়ার সামাজিক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করবে।

ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এগুলো কি কেবল বিচ্ছিন্ন আইনি ব্যবস্থা, নাকি রাশিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের বহিঃপ্রকাশ? এর উত্তর খুঁজছে শুধু রাশিয়াই নয়, গোটা আন্তর্জাতিক মহল।