কথায় নারীশক্তি, কাজে পিছিয়ে: বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী তালিকায় বিজেপির দ্বৈত চিত্র

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 d ago
কথায় নারীশক্তি, কাজে পিছিয়ে: বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী তালিকায় বিজেপির দ্বৈত চিত্র
কথায় নারীশক্তি, কাজে পিছিয়ে: বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী তালিকায় বিজেপির দ্বৈত চিত্র
দেবকিশোর চক্রবর্তী
 
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবারও এক নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে। একদিকে সংসদে মহিলা সংরক্ষণ বিল নিয়ে জোরালো বক্তব্য, অন্যদিকে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী তালিকায় মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব—এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক চোখে পড়ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যের ২৯৪টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় জনতা পার্টি-এর মহিলা প্রার্থীর হার মাত্র প্রায় ১১%। অর্থাৎ মোট আসনের হিসেবে বিজেপির তরফে প্রায় ৩০-৩৫ জনের মতো মহিলা প্রার্থী মাঠে নামানো হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
 
তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস, যাদের মহিলা প্রার্থী প্রায় ১৭%—সংখ্যার হিসেবে তা দাঁড়ায় আনুমানিক ৫০ জনের কাছাকাছি। বাম ও কংগ্রেস জোটের ক্ষেত্রেও এই হার প্রায় ১৩%, অর্থাৎ প্রায় ৩৫-৪০ জন মহিলা প্রার্থী। এই তুলনামূলক চিত্রই এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।
 
এই পরিসংখ্যান স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে—মহিলা ক্ষমতায়নের প্রশ্নে বিজেপির অবস্থান ঠিক কতটা আন্তরিক? বিশেষ করে যখন কেন্দ্রীয় স্তরে দলটির নেতৃত্ব মহিলা সংরক্ষণ আইন নিয়ে নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করছে এবং বিরোধীদের সমালোচনায় সরব হচ্ছে, তখন রাজ্যের প্রার্থী তালিকা যেন এক ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলির জন্য প্রার্থী নির্বাচন কেবল সংখ্যার খেলা নয়, বরং তা একটি আদর্শগত অবস্থানের প্রতিফলন। সেই জায়গা থেকেই প্রশ্ন উঠছে—যদি সত্যিই নারী নেতৃত্বকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকে, তবে প্রার্থী তালিকায় তার প্রতিফলন কোথায়? বিজেপির তরফে যদিও দাবি করা হচ্ছে যে যোগ্যতার ভিত্তিতেই প্রার্থী নির্বাচন হয়েছে, তবুও নারী প্রতিনিধিত্বের এই তুলনামূলক কম হারকে ঘিরে বিতর্ক থামছে না।
 
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরেই নারী নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে আসছে। পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে বিধানসভা ও লোকসভা—বিভিন্ন স্তরে মহিলা প্রার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে তারা। এবারের প্রার্থী তালিকাতেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ইঙ্গিত মিলেছে। যদিও বিরোধীরা এটিকে রাজনৈতিক কৌশল বলেই ব্যাখ্যা করছে।
বাম ও কংগ্রেস জোটও নারী প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে বিজেপির থেকে এগিয়ে থাকলেও, তাদের হার এখনও শাসক দলের তুলনায় কম। ফলে সামগ্রিকভাবে রাজ্যের রাজনীতিতে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রশ্নটি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।
 
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন প্রণয়ন বা সংসদে বক্তৃতা নয়, বাস্তবে দলীয় কাঠামো ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই আসল পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় কে কতটা সফল, তা বোঝা যায় এই ধরনের প্রার্থী তালিকার মাধ্যমেই।এই প্রেক্ষাপটে বিজেপির অবস্থান নিয়ে সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে নারী সংরক্ষণ আইনকে সামনে রেখে নিজেদের ‘নারী-বন্ধু’ ইমেজ তুলে ধরার চেষ্টা যখন চলছে, তখন রাজ্যের বাস্তব চিত্র যেন সেই প্রচারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
 
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে নারী প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। সংখ্যার নিরিখে ১১% বনাম ১৭% বনাম ১৩%—এই ফারাকই এখন রাজনৈতিক আলোচনার মূল কেন্দ্র। এখন দেখার, এই বিতর্ক ভোটের ময়দানে কতটা প্রভাব ফেলে এবং ভবিষ্যতে দলগুলি তাদের কৌশলে কোনও পরিবর্তন আনে কি না।