১১২-র তিন দীপশিখা—ভোটে উচ্ছ্বাসে উজ্জ্বল পশ্চিম মেদিনীপুর

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 d ago
১১২-র তিন দীপশিখা—ভোটে উচ্ছ্বাসে উজ্জ্বল পশ্চিম মেদিনীপুর
১১২-র তিন দীপশিখা—ভোটে উচ্ছ্বাসে উজ্জ্বল পশ্চিম মেদিনীপুর
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

পশ্চিম মেদিনীপুরে ভোট মানেই উৎসব। আর সেই উৎসবে এ বার আলাদা মাত্রা যোগ করেছেন তিন প্রবীণতম ভোটার—উষারানি মাল, ভুয়ান্তি মান্না এবং সর্বাণী মিশ্র। বয়স তাঁদের প্রত্যেকেরই ১১২ বছর, তবুও ভোটাধিকার প্রয়োগে তাঁদের আগ্রহ ও উৎসাহ তরুণদেরও হার মানায়। তিন জন তিন রকম স্বভাব, তিন রকম জীবনযাপন—তবুও এক সুতোয় বাঁধা তাঁদের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি এবং গণতন্ত্রের প্রতি অটল বিশ্বাস।
 
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার এই তিন প্রবীণার জীবনযাত্রা যেমন আলাদা, তেমনই তাঁদের পছন্দ-অপছন্দও ভিন্ন। উষারানি মাল প্রতিদিন এক কিলোমিটার হাঁটাকে নিজের অভ্যাসে পরিণত করেছেন। বয়স যে কেবল একটি সংখ্যা—তা তিনি যেন নিজের জীবন দিয়েই প্রমাণ করেন। অন্যদিকে ভুয়ান্তি মান্নার টিফিনে চাই পান্তাভাত, তেঁতুলের টক আর চুনো মাছ ভাজা—গ্রামীণ বাংলার একেবারে স্বাদমাখা চিত্র। আর সর্বাণী মিশ্রের দিন শুরু হয় লিকার চা দিয়ে, তবে তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ দিনে ১০টির বেশি দোক্তা পান—যা ছাড়া তাঁর দিন অসম্পূর্ণ।
 
তাঁদের জীবনযাত্রা আলাদা হলেও মিল রয়েছে অনেক। তিন জনই মহিলা, তিন জনেরই বয়স ১১২ বছর, উচ্চতা প্রায় চার ফুট, এবং তিন জনই এই জেলার বাসিন্দা। তবে তাঁরা থাকেন আলাদা জায়গায়—উষারানি মাল নারায়ণগড় বিধানসভা কেন্দ্রের বাসিন্দা, ভুয়ান্তি মান্নার বাড়ি দাঁতনে এবং সর্বাণী মিশ্র থাকেন পিংলায়।
 
এই তিন প্রবীণার উপস্থিতি শুধুমাত্র পরিসংখ্যানের বিষয় নয়—তাঁরা হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণার প্রতীক। বিশেষ করে যখন জানা যায়, ভারত নির্বাচন কমিশন তাঁদের বাড়িতে পৌঁছে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করেছে। বয়স ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও যাতে তাঁরা ভোট দিতে পারেন, সেই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় ১০০ বছরের ঊর্ধ্বে ভোটারের সংখ্যা মোট ৩২৯ জন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ এই তিন নারী। তাঁদের ঘিরে ইতিমধ্যেই চর্চা শুরু হয়েছে জেলা জুড়ে। স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে প্রশাসন—সবাই মুগ্ধ তাঁদের জীবনীশক্তিতে।
 
উষারানি মাল জানান, “ভোট দেওয়া আমার দায়িত্ব। যতদিন বাঁচব, ততদিন ভোট দেব।” তাঁর কথায় স্পষ্ট—গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা কতটা গভীর। একইভাবে ভুয়ান্তি মান্না ও সর্বাণী মিশ্রও ভোট দেওয়াকে জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন।এই তিন প্রবীণার গল্প শুধুমাত্র বয়সের বিস্ময় নয়—এটি এক সামাজিক বার্তা। যেখানে অনেক তরুণ ভোট দেওয়ার প্রতি অনীহা দেখান, সেখানে শতবর্ষ পার করা এই মহিলারা দেখিয়ে দিচ্ছেন, দায়িত্ববোধের কোনও বয়স হয় না।
 
প্রথম দফার ভোটের আগে এই তিনজনকে ঘিরে যেন এক অন্যরকম আবেগ তৈরি হয়েছে জেলায়। তাঁদের দেখতে ভিড় করছেন অনেকেই, শুনছেন তাঁদের জীবনের গল্প। তাঁদের উপস্থিতি যেন এক জীবন্ত ইতিহাস—যেখানে সময় থেমে নেই, বরং এগিয়ে চলেছে দৃঢ় পদক্ষেপে।শেষ পর্যন্ত বলা যায়, উষারানি মাল, ভুয়ান্তি মান্না এবং সর্বাণী মিশ্র শুধু ভোটার নন—তাঁরা এক একটি অনুপ্রেরণার নাম। তাঁদের জীবনের সরলতা, অভ্যাসের ভিন্নতা এবং গণতন্ত্রের প্রতি অটল বিশ্বাস—সব মিলিয়ে তাঁরা হয়ে উঠেছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের গর্ব।