রত্না জি চোত্রাণী
বর্তমান সময়ে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং নানা আবেগগত চ্যালেঞ্জের কারণে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে। কাউন্সেলর, থেরাপিস্ট, মনোবিজ্ঞানী কিংবা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়ার পাশাপাশি মানুষ এখন তাঁদের যোগ্যতা ও দক্ষতা সম্পর্কেও সচেতন। একজন থেরাপিস্টের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা সাধারণত মাস্টার্স ডিগ্রি হলেও, শুধুমাত্র ডিগ্রি নয়, একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা, সহমর্মিতা এবং নিরাপদ পরিবেশ তৈরির দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই গুণগুলির সমন্বয় ঘটিয়েই হোলিস্টিক সাইকোলজিস্ট সাহের আলি কাউন্সেলিংয়ের জগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছেন। তাঁর পেশাগত পথচলা স্পষ্ট লক্ষ্য, উদ্দেশ্যপূর্ণ অগ্রগতি এবং মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার এক গভীর অঙ্গীকারের উপর ভিত্তি করে নির্মিত।
সাহের আলি
এম.এসসি. ডিগ্রিধারী সাহের আলি মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাময়কে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন। তিনি বিশ্বাস করেন, “সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য মানুষের অন্তর্জগৎ ও বহির্জগৎ, উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি।” জীবনের কোনও না কোনও সময়ে প্রত্যেক মানুষেরই মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নের প্রয়োজন হয়। আর অনেকের জন্য শিল্প বা আর্ট-থেরাপিই হয়ে ওঠে শান্তি ও আত্মউদ্ধারের পথ। এই ভাবনা থেকেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সাহের আলির টোটাম’স স্টুডিও, যেখানে শিল্পকে ব্যবহার করা হয় মনোযোগকে স্থির করতে এবং নিজের প্রতি সহমর্মিতা গড়ে তুলতে।
সাহের আলির বিশ্বাস, শিল্পের কোনও সীমান্ত নেই; এটি মানুষকে কাগজে যেমন নিজের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করে, তেমনই জীবনের ক্ষেত্রেও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে। তাঁর পদ্ধতি সত্যিই পথপ্রদর্শক। স্নেহ, যত্ন ও ভালোবাসার উত্তরাধিকার এবং সেনা-পরিবারের শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা সাহের তাঁর উৎসাহদায়ী বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবোধকে নিজের প্রশিক্ষণ ও কাজের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করেছেন।
সাহের আলি তাঁর ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে
সাহের আলি তাঁর প্রশিক্ষণ শুরু করেন বেঙ্গালুরুর মন্টফোর্ট কলেজে। সেখানে তিনি নিরাময়ের বিকল্প পদ্ধতি যেমন রেইকি, অ্যাকুপ্রেশার, প্রাণিক হিলিং এবং হোমিওপ্যাথি নিয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। এই ভিত্তি তাঁকে মানসিক স্বাস্থ্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।
এরপর তাঁর কর্মজীবন বিস্তৃত হয়েছে নানা ক্ষেত্রে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস, অলাভজনক সংস্থা এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি অভিজ্ঞতা মানুষের জীবন ও মানসিকতার প্রতি তাঁর উপলব্ধিকে আরও গভীর করেছে। তিনি উপলব্ধি করেছেন, পরিবেশ কীভাবে আবেগগত সুস্থতাকে প্রভাবিত করে এবং কীভাবে নিরাময় চাপিয়ে দেওয়া যায় না, বরং আমন্ত্রণ জানাতে হয়।
সাহের আলি তাঁর ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে
সাহেরের মতে, শিল্প আর শুধুমাত্র স্টুডিওর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এখন স্বতঃস্ফূর্ততা, সৃজনশীলতা এবং অবসরের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা। তিনি শিল্পের মাধ্যমে মানসিক আঘাতে বিপর্যস্ত মানুষের জন্য নিরাপদ পরিসর তৈরি করেন। যৌথ চিত্রাঙ্কন কর্মশালার মাধ্যমে তিনি শোককে রূপান্তরিত করেন সম্মিলিত প্রকাশ ও আশায়। সাহেরের ভাষায়, তাঁর থেরাপি ক্যানভাসকে এমন এক নিরাপদ জায়গায় পরিণত করে, যেখানে মানুষ নিজের আবেগ ও মানসিক চাপকে মুক্তভাবে প্রকাশ করতে পারে।
তাঁর থেরাপির প্রভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা মানুষের জীবনে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। একসময় যেখানে পথচারীদের অবজ্ঞা ও উপহাস ছিল নিত্যসঙ্গী, সেখানে আজ দেখা যায় কৌতূহল ও বিস্ময়। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরাও নিজের হাতে তুলি তুলে নিয়ে শিল্পকর্মে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। তাঁদের অংশগ্রহণে ফাঁকা ক্যানভাস ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে এক সুন্দর শিল্পকর্মে।
সাহের আলি তাঁর ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে
বর্তমানে সাহের আলির বিভিন্ন কর্মসূচি ছাত্রছাত্রী ও পেশাজীবীদের সুস্থতার চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে পরিকল্পিত। স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট, মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং আরও নানা বিষয়ে তিনি বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। সাহের এই কাজকেই তাঁর প্রকৃত আহ্বান বা জীবনের লক্ষ্য বলে মনে করেন। সৃজনশীল এবং দেহ-মন-সমন্বিত মনস্তাত্ত্বিক নিরাময়ের মাধ্যমে অন্যদের ক্ষমতায়িত করার গভীর আবেগই তাঁকে এই পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।