আর্সালা খান
ভারতে নারীর অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মুসলিম নারীদের ক্ষমতায়নের আলোচনা হলেই যাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তিনি শাইস্তা অম্বর। এমন এক সময়ে, যখন বহু মুসলিম নারীর জন্য ঘরের বাইরে পা রাখাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, তখন তিনি সাহসের সঙ্গে সামাজিক রক্ষণশীলতার বেড়াজাল ভেঙে এগিয়ে আসেন। শুধু গোঁড়া প্রথার বিরুদ্ধেই তিনি সোচ্চার হননি, বরং মুসলিম নারীদের তাঁদের প্রকৃত ধর্মীয় ও সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কেও সচেতন করে তুলেছেন। বর্তমানে অল ইন্ডিয়া মুসলিম উইমেন পার্সোনাল ল’ বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা-সভানেত্রী এবং বিশিষ্ট সমাজকর্মী হিসেবে শাইস্তা অম্বর দেশের কোটি কোটি মানুষের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম।
শাইস্তা অম্বরের জন্ম ১৯৬২ সালে উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদে (বর্তমান প্রয়াগরাজ) এক শিক্ষিত ও সম্মানিত পরিবারে। তাঁর বাবা রেলওয়ের গার্ড ছিলেন এবং মা ছিলেন সুপরিচিত উর্দু কবি। সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবেশে বেড়ে ওঠা শাইস্তা ছোটবেলা থেকেই বই ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার মধ্যে বড় হন। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী বলে মনে করতেন এবং পড়াশোনায়ও তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। অল্প বয়স থেকেই তিনি দেশের ও বিদেশের খ্যাতনামা পত্র-পত্রিকায় গল্প ও প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন।
পরবর্তীতে তিনি বিশিষ্ট আমলা ও খ্যাতনামা উর্দু কবি মোহাম্মদ ইদরিস অম্বরের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এক সাহিত্যিক পরিবেশ থেকে আরেক সাহিত্যিক পরিবেশে এসে শাইস্তা পড়াশোনা, লেখালেখি এবং সমাজকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের কাজ চালিয়ে যান। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে নারীদের প্রতি বৈষম্যের বাস্তব চিত্র উপলব্ধি করতে সাহায্য করে এবং তাঁর মধ্যে একজন সমাজসংস্কারকের চেতনার জন্ম দেয়।
১৯৯৭ সালের দিকে লখনউয়ে বসবাসকালে শাইস্তা অম্বর সক্রিয়ভাবে সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত হন। প্রতিদিন বহু মুসলিম নারী গার্হস্থ্য হিংসা বা আকস্মিক তালাকের শিকার হয়ে তাঁর কাছে সাহায্যের জন্য আসতেন। অনেক পরিবার মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে যাচ্ছিল তাৎক্ষণিক তিন তালাকের কারণে, যা কখনও রাগের মাথায়, কখনও মদ্যপ অবস্থায়, আবার কখনও ফোনের মাধ্যমেও দেওয়া হতো। অসহায় নারীদের এই দুর্দশা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
সমস্যার প্রকৃত কারণ বোঝার জন্য শাইস্তা কোরআন এবং ইসলামি আইনশাস্ত্র নিয়ে গভীর গবেষণা শুরু করেন। তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল, তাৎক্ষণিক তিন তালাক, হালালা, বহুবিবাহ এবং মোহরানা না দেওয়ার মতো প্রথাগুলি ইসলামের মৌলিক অংশ নয়; বরং সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা সামাজিক বিকৃতি, যা নারীদের শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এরপর তিনি এই প্রথাগুলির বিরুদ্ধে দীর্ঘ আইনি ও সামাজিক আন্দোলন শুরু করেন। বহু বছরের গবেষণার পর তিনি একটি ‘মডেল নিকাহনামা’ (বিবাহ চুক্তিপত্র) তৈরি করেন, যা দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা পায়। এই নথিতে বিয়ের সময় নারীদের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
মুসলিম সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করা অধিকাংশ সংগঠনই পুরুষ-প্রধান ছিল। ফলে নারীদের নিজেদের সমস্যার কথা বলার মতো স্বাধীন পরিসর খুবই সীমিত ছিল। এই শূন্যতা দূর করতেই শাইস্তা অম্বর ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম উইমেন পার্সোনাল ল’ বোর্ড’, যা ভারতের সামাজিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি মুসলিম নারীদের এমন একটি শক্তিশালী মঞ্চ করে দেন, যেখানে তাঁরা নির্ভয়ে বিয়ে, তালাক, ভরণপোষণ, শিক্ষা ও সম্পত্তির অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত ও সমস্যার কথা তুলে ধরতে পারেন। পাশাপাশি তিনি দেশজুড়ে সচেতনতামূলক প্রচারও পরিচালনা করেন। শাইস্তার মতে, নারীদের শুধু ভারতীয় সংবিধান নয়, তাঁদের ধর্মে প্রদত্ত অধিকার সম্পর্কেও সমানভাবে সচেতন হওয়া উচিত।ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যখন তাৎক্ষণিক তিন তালাককে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে, তখন তিনি সেই রায়কে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান এবং একে ভারতের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর বিজয় বলে অভিহিত করেন।
মসজিদে নারীদের প্রবেশাধিকার ও জামাতে নামাজ আদায়ের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। বিশেষ করে উত্তর ভারতে নারীদের জন্য মসজিদে জামাতে অংশগ্রহণের সুযোগ ঐতিহ্যগতভাবে খুবই সীমিত ছিল।এই রক্ষণশীল প্রথাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে শাইস্তা অম্বর লখনউয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অম্বর মসজিদ’। এটি নারীদের সুবিধা ও অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নির্মিত ভারতের প্রথম মসজিদ হিসেবে পরিচিত।
অম্বর মসজিদে নারী ও পুরুষ উভয়েই পৃথক সারিতে মর্যাদা ও সমতার সঙ্গে জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন। শাইস্তার মতে, ইসলামে কোথাও নারীদের মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়নি। আজ এই মসজিদ শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং লিঙ্গসমতা ও প্রগতিশীল সামাজিক চিন্তার শক্তিশালী প্রতীক।
শাইস্তা অম্বরের প্রভাব ভারতের গণ্ডি ছাড়িয়েও বিস্তৃত। ২০১৯ সালে তাঁকে আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা পুরস্কার এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ অ্যাওয়ার্ড’-এর জন্য ভারতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে মনোনীত করা হয়। এছাড়াও তিনি ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী নারীদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
তাঁর সবচেয়ে আলোচিত বক্তৃতাগুলির একটি ছিল একটি TEDx অনুষ্ঠানে, যেখানে তিনি দেশের মুসলিম নারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “ভারতের মুসলিম নারীরা এক হাতে পবিত্র কোরআন এবং অন্য হাতে ভারতের সংবিধান নিয়ে এগিয়ে চলবেন।” এই বক্তব্যই তাঁর দর্শনের সারাংশ। তাঁর বিশ্বাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেশের আইনের মধ্যে কোনও সংঘাত নেই; বরং এই দুটিই একসঙ্গে নারীদের ক্ষমতায়ন করে এবং সমাজে তাঁদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে।
শাইস্তা অম্বর
শাইস্তা অম্বরের দৃঢ় বিশ্বাস, কোনও সমাজই তার কন্যাদের শিক্ষিত না করে এগিয়ে যেতে পারে না। তাই তিনি সবসময় মুসলিম কন্যাদের আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের পক্ষে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, একজন শিক্ষিত নারী শুধু নিজেই স্বনির্ভর হন না, বরং তাঁর পুরো পরিবারের মানসিকতারও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটান। তিনি সংসদ ও রাজ্য বিধানসভায় নারীদের জন্য সংরক্ষণেরও জোরালো সমর্থক। তাঁর মতে, নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি না পেলে নারীর নিরাপত্তা ও উন্নয়নে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
বর্তমানে শাইস্তা অম্বর তাঁর এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে লখনউয়ে বসবাস করেন। তাঁর নির্ভীক ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব নিয়ে তাঁর পরিবার অত্যন্ত গর্বিত। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, দৃঢ় সংকল্প এবং মহৎ উদ্দেশ্য থাকলে শতাব্দীপ্রাচীন সামাজিক বাধাও ভেঙে ফেলা সম্ভব। আজ তিনি নিজের অধিকার, মর্যাদা ও সমতার জন্য লড়াই করা প্রতিটি ভারতীয় নারীর এক উজ্জ্বল মুখ হয়ে উঠেছেন।