ভি. পি. সুহারা
এম শ্রীলতা
ভি. পি. সুহারার সঙ্গে কয়েক মাস আগে কথা বলার অভিজ্ঞতা ছিল যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া এক সমাজকর্মীর সাক্ষাৎ। একের পর এক সংক্ষিপ্ত ফোনালাপ, যা প্রায়ই হঠাৎ শেষ হয়ে যেত, তার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল মুসলিম নারীরা প্রতিদিন যে অবিচারের শিকার হন, তা বদলে দেওয়ার তাঁর প্রবল অস্থিরতা। তাঁর বিশ্বাস, ইসলামে নারীদের যে অধিকার স্বীকৃত, তার ভুল ব্যাখ্যাই এই অবিচারের মূল উৎস।
সেই ভাঙা-ভাঙা কথোপকথনে তিনি বারবার বলতে চেয়েছিলেন, অন্যায় তাঁর ধর্মে নেই, দেশের সংবিধানেও নেই। অন্যায় রয়েছে ধর্মকে যেভাবে পালন ও ব্যাখ্যা করা হয়, সেখানে। সংবিধান ও ইসলাম যে ন্যায়বিচার এবং সমতার প্রতিশ্রুতি দেয়, মুসলিম নারীদের দৈনন্দিন জীবনে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগের অভাবই প্রকৃত সমস্যা।
নিজের পরিবারের আত্মীয়-স্বজনদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই ভি. পি. সুহারা জীবনের খুব অল্প বয়সেই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেছিলেন। এরপর তাঁর গোটা জীবনই কেরলসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম সমাজে প্রচলিত কিছু রীতিনীতি নিয়ে তাঁর প্রশ্ন ও সংশয়কে আরও দৃঢ় করেছে। সমতার প্রশ্ন অনেক সময় ঘরের ভেতর থেকেই উঠে আসে, সম্পত্তি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে, শোকের পর নীরবতার মধ্যে, কিংবা এমন নীরব সামাজিক ব্যবস্থায়, যেখানে নারীদের নিজেদের অধিকার দাবি না করে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়।
ভি. পি. সুহারা বলেন, “শৈশবের অভিজ্ঞতাই আমাকে এভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল। প্রথমে মনে হয়েছিল, এই সমস্যাগুলো শুধু আমাদের বাড়িতেই আছে। পরে বুঝলাম, এগুলো অসংখ্য নারীর অভিজ্ঞতা।” যা একসময় ব্যক্তিগত বলে মনে হয়েছিল, ধীরে ধীরে তা একটি বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার রূপ প্রকাশ করে।
শাহ বানো মামলাকে ঘিরে হওয়া বিতর্ক তাঁর এই উপলব্ধিকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। সুহারার কাছে বিষয়টি কখনও শুধু একটি আদালতের রায় ছিল না। তিনি বলেন, “সমস্যা সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ছিল না। তখনই বুঝেছিলাম, প্রকৃত সমস্যা হলো ঔপনিবেশিক আমলে গড়ে ওঠা ব্যক্তিগত আইন।”
তিনি বলেন, “১৯৩৭ সালে কার্যকর হওয়া মুসলিম পার্সোনাল ল' এমন ব্যক্তিদের দ্বারা প্রণীত হয়েছিল, যাঁদের ইসলাম সম্পর্কে যথাযথ ধারণা ছিল না। তারও আগে ১৯০৬ সালে স্যার ডি. এফ. মুল্লা প্রিন্সিপলস অব মোহামেডান ল গ্রন্থটি লেখেন এবং শরিয়াহ আইনের বহু ব্যাখ্যা সেখান থেকেই নেওয়া হয়।
পরে ১৯৩৯ সালে আইনটি সংশোধিত হয়। কিন্তু তার ব্যাখ্যাগুলো ছিল ত্রুটিপূর্ণ এবং এমন ব্যক্তিদের দ্বারা করা, যাঁরা মুসলমানদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।” তাঁর মতে, পরবর্তী সময়ের ব্যাখ্যাগুলিও সেই প্রথম দিকের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল, যা ব্রিটিশ আইনি কাঠামোর গভীর প্রভাব বহন করে। তাঁর বিশ্বাস, এখনই সময় এই ভুল সংশোধনের।
এই উপলব্ধিই তাঁকে বুঝিয়েছিল, ন্যায়বিচার তাঁর ধর্মের পরিপন্থী নয়। তিনি বলেন, “নবীর ইসলাম নারীদের বিরুদ্ধে নয়। সমস্যা কোরআনে নয়, সমস্যা তার ব্যাখ্যায়।” তাঁর মতে, যাকে ধর্মীয় সত্য হিসেবে তুলে ধরা হয়, তার অনেকটাই বেছে নেওয়া ব্যাখ্যা এবং ইতিহাসের বিকৃত উপস্থাপনার ফল।
কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর সঙ্গে ভি. পি. সুহারা
আশির দশকের শেষ দিকে তিনি আরও সক্রিয়ভাবে জনজীবনে যুক্ত হন। নারীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাঁদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা গভীরভাবে জানতে শুরু করেন। তিনি বলেন, “তিন তালাক এবং বহুবিবাহের মতো বিষয় নিয়ে যখন নারীদের সঙ্গে কাজ শুরু করি, তখনই বুঝতে পারি সমস্যার গভীরতা কতটা।” উত্তরাধিকার আইনও তাঁর মতে অবিচারের অন্যতম বড় উৎস।
তাঁর অভিযোগ, ব্যক্তিগত আইন উত্তরাধিকারের এমন ব্যাখ্যা দেয়, যা নারীদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট। তিনি বলেন, “এই আইনগুলোর কারণেই পরিবারে সবচেয়ে বেশি সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়।” তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, “যখন একজন ভাই দুই ভাগ সম্পত্তি পায় আর বোন পায় মাত্র এক ভাগ, তখন তাকে কীভাবে সমতা বলা যায়?” তবে তাঁর মতে, এর প্রভাব শুধু সম্পত্তির ভাগেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
তিনি বলেন, “অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নিজের প্রাপ্য অংশ পাওয়ার পরও বোনদের পরিবার থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।” আর বিধবাদের অবস্থা আরও বেশি অনিশ্চিত। “এমন বহু নারী আছেন, যাঁরা স্বামীর মৃত্যুর পর কিছুই পান না এবং স্বামীর পরিবারের কারণে চরম অনিরাপত্তার মধ্যে পড়ে যান।”
এই অভিজ্ঞতাগুলো প্রমাণ করে, শুধু আইনের কাগজে নয়, বাস্তব জীবনেও আইন ও সামাজিক প্রথা মিলেই নারীদের বঞ্চনার একটি ধারাবাহিক কাঠামো তৈরি করেছে। তাঁর বিশ্বাস, ইসলাম এবং ভারতের সংবিধান, দুটোর মধ্যেই ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের সংবিধানে ধর্মের নামে কারও অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।”
তাঁর দাবি স্পষ্ট। “আমরা ইউনিফর্ম সিভিল কোড চাইছি না। আমরা শুধু সেই ন্যায়বিচার চাইছি, যার নিশ্চয়তা ভারতের সংবিধান দিয়েছে।” বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই পার্থক্যটি তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।তিনি বলেন, “আজ যারা ক্ষমতায় রয়েছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের অবস্থান থেকে রাজনীতি করছে। তাই ইউনিফর্ম সিভিল কোড নিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় রয়েছে।” তবে সেই ভয়কে তিনি নিজের সমাজের ভেতরের প্রশ্ন তোলার পথে বাধা হতে দেন না। “সমতার দাবি তোলাকে অন্য কিছুর সমর্থন বলে ভুল ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাইছি।”
সুহারা স্মরণ করেন, আশির দশকে মহিলা কমিশন গঠনের পর থেকেই নারীদের সমস্যা নতুন করে আলোচনায় আসে। তখন কবি, পরিবেশবিদ ও নারী অধিকারকর্মী সুগতকুমারী মুসলিম নারীদের প্রতি অবিচারের প্রশ্ন বারবার তুলে ধরতেন। সেই সময়ই তাঁর মনে হয়েছিল, মুসলিম নারীদের নিজেদের সমস্যার কথা নিজেরাই তুলে ধরা উচিত। তিনি বলেন, “আমরা অনুভব করেছিলাম, আমাদের সমস্যার কথা আমাদেরই বলতে হবে। সেখান থেকেই আমাদের সংগঠিত হওয়ার শুরু।”
ভি. পি. সুহারা
বিভিন্ন মঞ্চ ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে মুসলিম নারীরা বহুদিনের নীরব অভিজ্ঞতাগুলো প্রকাশ্যে আনতে শুরু করেন। সুহারা বলেন, “অনেক মানুষ আমাদের ফোন করে নিজেদের সমস্যার কথা জানান। কলেজে গেলে বুঝতে পারি, এখনও অনেকেই এসব বিষয়ে সচেতন নন।”
এক বছর আগে তিনি দিল্লির জনপথে অবস্থান বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত একটি ব্যক্তিগত সদস্যের বিল সংসদে উত্থাপন করতে হবে। তিনি বলেন, “আমরা শুধু সেই ন্যায়বিচার চাইছি, যার প্রতিশ্রুতি ভারতের সংবিধান দিয়েছে।”
এটি একটি সহজ দাবি, কিন্তু এর গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ এই দাবি এসেছে সমাজের ভেতর থেকে, ধর্মের ভেতর থেকে এবং হাজার হাজার মুসলিম নারীর বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। ভি. পি. সুহারা এই অবস্থানেই অনড়। আর নিজের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একাংশের সমালোচনার মুখেও তাঁর এই দৃঢ় অবস্থানই তাঁর যুক্তিকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।