শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
উত্তর ২৪ পরগনার সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রাম হিঙ্গলগঞ্জের উত্তর মামুদপুর, যেখানে দারিদ্র্য, কুসংস্কার আর পিতৃতান্ত্রিক শৃঙ্খল বহুদিন ধরে নারীদের জীবনকে আটকে রেখেছিল, সেখান থেকেই উঠে এসেছেন এক সাহসী নাম, হালিমা খাতুন । নিজের জীবনের সংগ্রামকে হাতিয়ার করে তিনি আজ হয়ে উঠেছেন হাজারো নারীর মুক্তির মুখ।
বিড়ি বাঁধা শ্রমিক পরিবারের মেয়ে হালিমা ছোট থেকেই দেখেছেন নারীদের অসহায়তা, অল্প বয়সে বিয়ে, শিক্ষার অভাব, আর ন্যূনতম অধিকার থেকেও বঞ্চিত জীবন। কিন্তু এই বাস্তবতাকেই তিনি মেনে নেননি। কলকাতায় পড়াশোনা করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, তার গ্রামের মতো অসংখ্য অঞ্চলে নারীরা আজও নীরবে বঞ্চনার শিকার।
সামাজিক কর্মে ব্যস্ত হালিমা খাতুন
২০০৯ সালে তিনি যুক্ত হন অ্যাকশন এইড ইন্ডিয়া-এর সঙ্গে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার মাটির কাছাকাছি কাজ। গ্রামে গ্রামে গিয়ে তিনি শুধু সমস্যার কথা শোনেননি, বরং নারীদের একত্রিত করে তাদের নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করতে শিখিয়েছেন।
এই লড়াইয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক, শিশুবিবাহ রুখে দেওয়ার সাহসী অভিযান। বহু ক্ষেত্রে হালিমা নিজে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে বিয়ের আসরে পৌঁছে গিয়ে সেই বিয়ে থামিয়ে দিয়েছেন। যেখানে সমাজের একাংশ তাকে বাধা দিয়েছে, হুমকি দিয়েছে, সেখানেই তিনি আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছেন। ফলে আজ বহু কিশোরী নতুন করে স্কুলে ফিরেছে, পেয়েছে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ।
সামাজিক কর্মে ব্যস্ত হালিমা খাতুন
তার উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘হাসনাবাদ-হিঙ্গলগঞ্জ মুসলিম মহিলা সংঘ’, যেখানে এখন হাজার হাজার নারী একসঙ্গে নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলছেন। আগে যাদের পরিচয় ছিল শুধু গৃহবন্দি জীবন, আজ তারা নিজেদের ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার দাবি তুলছেন।
হালিমার পথ সহজ ছিল না। তাকে ‘বিরোধী সংস্কৃতি’ ছড়ানোর অভিযোগে আক্রমণ করা হয়েছে, প্রাণনাশের হুমকিও এসেছে। তবু তিনি থামেননি। বরং প্রতিটি বাধাকে তিনি রূপান্তর করেছেন শক্তিতে।
বাল্যবিবাহ রোধের অভিযানে হালিমা খাতুন
আজ সুন্দরবনের বহু গ্রামে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। যে সমাজে একসময় মেয়েদের কণ্ঠস্বর শোনা যেত না, সেখানে এখন তারা প্রতিবাদ করতে শিখেছে, নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে শিখেছে। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন হালিমা খাতুন, একজন নারী, যিনি শুধু নিজের জীবন নয়, হাজারো জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছেন।