শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংসহ জেলার সাতটি সরকারি হাসপাতালে গত ছ’মাস ধরে যে অভিনব উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, তার ফল এখন চিকিৎসা–বিশ্বকে বিস্মিত করছে। জন্মের পর প্লাসেন্টা বেরোনো পর্যন্ত নাড়ি না কেটে অপেক্ষা—‘এক্সটেন্ডেড কর্ড ক্ল্যাম্পিং’ নামে পরিচিত এই পদ্ধতি প্রথমে চিকিৎসকদের মধ্যে সংশয় তৈরি করলেও বাস্তব দেখাল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। মাত্র অর্ধেক বছরের মধ্যেই ৯,০০০ প্রসবে মা ও নবজাতকের মৃত্যু শূন্যে নেমে এসেছে, যা রাজ্যের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নজিরবিহীন সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নতুন এই পদ্ধতির ফলে সদ্যোজাতদের জন্ডিসে ফটোথেরাপির চাহিদা কমেছে প্রায় ৮২ শতাংশ। ভেন্টিলেটরের প্রয়োজন পড়েনি একটি শিশুরও। মায়েদের পোস্ট পারটাম হেমারেজের ঘটনাও কার্যত শূন্য। চিকিৎসকদের বক্তব্য, শিশুর জন্মের পর চার থেকে দশ মিনিট অপেক্ষা করে প্লাসেন্টাকে সম্পূর্ণভাবে তার কাজটি করতে দেওয়ায় শিশুর শরীরে পৌঁছে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত রক্ত ও স্টেম সেল। এতে নবজাতকের শ্বাসকষ্ট কমছে, রক্তসঞ্চালন স্থিতিশীল হচ্ছে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে এবং মস্তিষ্কের বিকাশেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিশেষ করে প্রিম্যাচিয়র শিশুদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা মিলছে ‘ইনট্যাক্ট কর্ড রিসাসিটেশন ট্রলি’ ব্যবহারে। শিশুকে মায়ের বুকেই রেখে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া যাচ্ছে, নাড়ি না কেটেই। এর ফলে জন্মের পর প্রথম মিনিটগুলিতে শিশুর গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক সূচকগুলো অনেক বেশি স্থিতিশীল থাকছে বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা।
দেশখ্যাত নবজাতক বিশেষজ্ঞ ডাঃ অরুণ সিং
দেশখ্যাত নবজাতক বিশেষজ্ঞ ডাঃ অরুণ সিং মনে করেন, এই পদ্ধতি চিকিৎসা বিজ্ঞানকে প্রকৃতির নিয়মের কাছে ফিরিয়ে এনেছে। তাঁর কথায়, “আমরা শুধু জন্মের মুহূর্তে মায়ের শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে সময় দিচ্ছি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাফল্য এখন বিশ্ব মানচিত্রে উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
ইতিমধ্যেই ক্যানিংয়ের সাফল্য ছড়িয়ে পড়ছে রাজ্যের অন্যান্য হাসপাতালেও। চিত্তরঞ্জন সেবাসদন, কলকাতা মেডিকেল কলেজসহ একাধিক মেডিকেল কলেজে শুরু হয়েছে একই পদ্ধতি। কলকাতা মেডিকেল কলেজে আলাদা করে দেখা গেছে, ৩২ সপ্তাহের কমে জন্ম নেওয়া শিশুদের মৃত্যুহার অর্ধেক কমে এসেছে। চিকিৎসকদের মতে, শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই নাড়ি কেটে ফেলার প্রচলিত অভ্যাস বদলে এই অপেক্ষাকৃত সহজ, কিন্তু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি রাজ্যের নবজাতক পরিচর্যায় এক নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে।
রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর মনে করছে, এই পদ্ধতি কার্যকরভাবে যদি প্রতিটি সরকারি হাসপাতালেই বাস্তবায়িত হয়, তা হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার আরও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। ছ’মাসে ৯ হাজার প্রসব, একটিও মৃত্যু নয়—পশ্চিমবঙ্গের এই সাফল্য এখন এক প্রকার চিকিৎসা–মিরাকল হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। মায়ের বুকের উষ্ণতা ও প্লাসেন্টার স্বাভাবিক সঞ্চালনকে কেন্দ্র করে তৈরি এই প্রসব–পদ্ধতি নবজাতক চিকিৎসায় নতুন দিশা দেখাচ্ছে দেশের সামনে।