ওয়াশিংটন ডিসি (আমেরিকা)
নাসার (NASA) মহাকাশচারী সুনীতা উইলিয়ামস ২৭ বছরের গৌরবময় কর্মজীবনের পর অবসর গ্রহণ করেছেন। নাসা মঙ্গলবার জানিয়েছে, গত বছরের বড়দিনের ঠিক পরদিন অর্থাৎ ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে তাঁর অবসর কার্যকর হয়েছে।
সুনীতা উইলিয়ামস আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS)-এ মোট তিনটি অভিযানে অংশ নিয়ে একাধিক উল্লেখযোগ্য রেকর্ড গড়েছেন। তিনি মহাকাশে মোট ৬০৮ দিন কাটিয়েছেন, যা নাসার কোনো মহাকাশচারীর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সময়। তাঁর শেষ ১০ দিনের মহাকাশ অভিযান আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে দীর্ঘায়িত হয়ে সাড়ে নয় মাসে পৌঁছায়।
নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান সুনীতা উইলিয়ামসের কৃতিত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “সুনীতা উইলিয়ামস মানব মহাকাশ অভিযানের এক অগ্রদূত। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে তাঁর নেতৃত্ব গবেষণা ও প্রযুক্তিতে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে এবং বাণিজ্যিক মহাকাশ অভিযানের পথ প্রশস্ত করেছে। তাঁর কাজ চাঁদের ‘আর্টেমিস’ মিশন এবং ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযানের ভিত্তি গড়ে তুলবে। তাঁর অসাধারণ সাফল্য আগামী প্রজন্মকে বড় স্বপ্ন দেখতে এবং অসম্ভবকে সম্ভব করতে অনুপ্রাণিত করবে।”
মহাকাশে ৬০৮ দিন কাটিয়ে সুনীতা উইলিয়ামস যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম একক মহাকাশ উড়ানের তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে রয়েছেন। তিনি বুচ উইলমোরের সঙ্গে ২৮৬ দিনের একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযান সম্পন্ন করেন। তিনি মোট ৯ বার স্পেসওয়াক করেছেন, যেখানে ৬২ ঘণ্টা ৬ মিনিট সময় অতিবাহিত করে একজন নারী মহাকাশচারী হিসেবে সর্বাধিক স্পেসওয়াকের রেকর্ড গড়েছেন। এ ছাড়াও তিনি মহাকাশে প্রথমবারের মতো ম্যারাথন দৌড় সম্পন্নকারী ব্যক্তি হিসেবেও ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন।
হিউস্টনের নাসা জনসন স্পেস সেন্টারের পরিচালক ভ্যানেসা উইঞ্চে বলেন, “সুনীতার কর্মজীবন ছিল অনুপ্রেরণাদায়ক ও পথপ্রদর্শক। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে তাঁর অবদান থেকে শুরু করে বোয়িং স্টারলাইনার অভিযানে তাঁর উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা, সবই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মহাকাশচারীদের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে।”
২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে স্পেস শাটল ডিসকভারি-র মাধ্যমে সুনীতা উইলিয়ামস তাঁর প্রথম অভিযান STS-116 শুরু করেন। পরে তিনি STS-117 ক্রুর সঙ্গে পৃথিবীতে ফিরে আসেন। তিনি ‘এক্সপেডিশন ১৪/১৫’-এ ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেন এবং এই সময়ে চারটি স্পেসওয়াক সম্পন্ন করেন।
২০১২ সালে তিনি কাজাখস্তানের বাইকোনুর কসমোড্রোম থেকে ১২৭ দিনের অভিযানে যাত্রা করেন। সেখানে তিনি ‘এক্সপেডিশন ৩২/৩৩’-এর সদস্য ছিলেন এবং ‘এক্সপেডিশন ৩৩’-এ আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি স্টেশনের রেডিয়েটর মেরামত ও সৌর প্যানেলের যন্ত্রাংশ বদলানোর জন্য তিনবার স্পেসওয়াক করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে, ২০২৪ সালের জুনে সুনীতা উইলিয়ামস ও বুচ উইলমোর বোয়িং স্টারলাইনার ক্রু ফ্লাইট টেস্ট মিশনে অংশ নিয়ে ‘এক্সপেডিশন ৭১/৭২’-এ যুক্ত হন। ‘এক্সপেডিশন ৭২’-এ তিনি আবার কমান্ডারের দায়িত্ব নেন এবং আরও দু’বার স্পেসওয়াক সম্পন্ন করেন। ২০২৫ সালের মার্চে তিনি ‘স্পেসএক্স ক্রু-৯’ মিশনের মাধ্যমে পৃথিবীতে ফিরে আসেন।
নাসার অ্যাস্ট্রোনট অফিসের প্রধান স্কট টিংগল বলেন, “সুনীতা অত্যন্ত মেধাবী, বন্ধুত্বপূর্ণ ও অনুপ্রেরণাদায়ক একজন মানুষ। তিনি আমাকে এবং আরও অনেক মহাকাশচারীকে অনুপ্রাণিত করেছেন। আমরা তাঁকে খুব মিস করব এবং তাঁর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানাই।”
নাসায় কর্মজীবনের সময় সুনীতা উইলিয়ামস বহু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ২০০২ সালে তিনি ‘NEEMO’ অভিযানে অংশ নিয়ে ৯ দিন সমুদ্রের তলায় বসবাস ও কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। প্রথম মহাকাশ অভিযানের পর তিনি নাসার অ্যাস্ট্রোনট অফিসের উপপ্রধান হন। পরবর্তীতে রাশিয়ার স্টার সিটিতে অপারেশনাল ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সর্বশেষ ভবিষ্যতের চন্দ্র অভিযানের প্রস্তুতিতে একটি হেলিকপ্টার প্রশিক্ষণ প্ল্যাটফর্ম স্থাপন করেন।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা
▪️ পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক – ইউনাইটেড স্টেটস নেভাল একাডেমি
▪️ ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর – ফ্লোরিডা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি
▪️ অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন
▪️ হেলিকপ্টার ও ফিক্সড-উইং বিমানে ৪,০০০ ঘণ্টার বেশি উড্ডয়নের অভিজ্ঞতা
অবসর গ্রহণের পর সুনীতা উইলিয়ামস বলেন, “যাঁরা আমাকে চেনেন, তাঁরা জানেন, মহাকাশই আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। তিনবার মহাকাশ ভ্রমণ এবং ২৭ বছর ধরে এই অসাধারণ সেবার অংশ হতে পারা আমার জন্য গর্বের বিষয়। নাসা ও তার সহযোগী সংস্থাগুলোর ভবিষ্যৎ অভিযান নিয়ে আমি ভীষণ আশাবাদী ও উচ্ছ্বসিত।”