হায়দ্রাবাদের হারিয়ে যাওয়া শাহী স্বাদ ফিরিয়ে আনছে ডাকনি সুইট ট্রিটস

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
আসরা আনজুম
আসরা আনজুম
 
রত্না জি. চোত্রাণী

হায়দ্রাবাদের নাম উচ্চারণ করলেই সবার আগে মনে পড়ে বিরিয়ানির কথা। কিন্তু এই শহরের ঐতিহ্য শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজপ্রাসাদের অন্তরালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লালিত হয়েছে এমন এক মিষ্টান্ন-সংস্কৃতি, যা একসময় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই ছিল। কাঁচের মতো ভঙ্গুর মিষ্টি, বাদাম ও দুধের সুবাসে ভরা পুডিং, আর মুখে গলে যাওয়া রূপার আবরণে সাজানো শাহী পদ, এসব ছিল রাজকীয় রান্নাঘরের অমূল্য সম্পদ। এতটাই সূক্ষ্ম ও শ্রমসাধ্য ছিল এই মিষ্টিগুলি যে সেগুলি তৈরি করতে দরকার হতো অসীম ধৈর্য ও দক্ষতা। সেই হারিয়ে যেতে বসা শাহী স্বাদ ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই জন্ম নিয়েছিল ডাকনি সুইট ট্রিটস।
 
১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ডাকনি এক সহজ অথচ সাহসী প্রশ্নকে সামনে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, হায়দ্রাবাদের বিরিয়ানিই কেন সমস্ত খ্যাতি পাবে, যখন এই শহরের মিষ্টান্নগুলিও সমানভাবে ইতিহাস বহন করে? প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ছিল শাহী ঐতিহ্যকে সকলের জন্য উন্মুক্ত করা, তবে সেই সঙ্গে বজায় রাখা সেই সব মিষ্টির স্বাতন্ত্র্য ও জাঁকজমক, যা একসময় শুধুমাত্র রাজকীয় রান্নাঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট, হায়দ্রাবাদের মিষ্টান্নকে সেই একই মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা, যা হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি ইতিমধ্যেই অর্জন করেছে।
 
আসরা আনজুম
 
এই পুনর্জাগরণের কেন্দ্রে রয়েছেন ডাকনি সুইট ট্রিটসের ডিরেক্টর আসরা আনজুম। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন বেলন, আর তারপর আর কখনও পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তাঁর শৈশবের বাড়িতে রান্নাঘর শুধু খাবার তৈরির জায়গা ছিল না; ছিল এক জীবন্ত আর্কাইভ। মার্বেলের স্ল্যাবে লেগে থাকত প্রজন্মের স্মৃতি, তামার ডেগচিতে ভেসে বেড়াত কেওড়া আর জাফরানের গন্ধ, আর অভিজ্ঞ হাতগুলো তাঁকে শিখিয়েছিল কীভাবে বাদামকে সূক্ষ্ম শিল্পে রূপান্তরিত করতে হয়।
 
তাঁর বিশেষত্ব হয়ে ওঠে বাদাম কি জালি, নিজাম আমলের এমন এক মিষ্টি, যা হায়দ্রাবাদ প্রায় ভুলেই যেতে বসেছিল। এই মিষ্টি তৈরির জন্য গুঁড়ো করা বাদামকে কাগজের মতো পাতলা স্তরে চাপ দিয়ে তৈরি করা হয়, তারপর তা এমন সূক্ষ্ম জালির নকশায় কাটা হয় যে তার ওপার দিয়ে লেখা পড়া যায়। তবে সবচেয়ে কঠিন কাজটি জালি তৈরি নয়, বরং তার পরের ধাপ। প্রতিটি ভঙ্গুর বাদামের স্তরের মাঝখানে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বসানো হয় খাদ্যোপযোগী রূপার পাত বা ‘ভরক’। একটুও না ছিঁড়ে সেই রূপার স্তর বসানো এমনই নিখুঁত কাজ, যা একসময় নিজামি খানসামারা রাজকীয় দাওয়াতের জন্য করতেন। সেই সব মিষ্টি দেখতে হতো গয়নার মতো আর মুখে গলে যেতে হতো আশীর্বাদের মতো।
 
শৈশবেই আসরা এই সূক্ষ্ম দক্ষতা আয়ত্ত করেন। বহু বছর তিনি পারিবারিক বিয়ে ও ঈদের আয়োজনে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। ১৯৯৪ সালে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এই ঐতিহ্যের স্বাদ গোটা শহরেরও পাওয়া উচিত। ডাকনি তাই কোনো বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং এক প্রতিশ্রুতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, শাহী রেসিপিগুলো যেন কখনও পুরোনো খাতার পাতায় হারিয়ে না যায়।
 
আসরা আনজুম
 
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেনু বড় হয়েছে, কিন্তু দর্শন বদলায়নি। উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে গিল-এ-ফিরদৌস। নামের অর্থ ‘স্বর্গের মাটি’, আর এই মিষ্টি সেই নামের মর্যাদা রাখে। সুগন্ধি চালকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুধে রান্না করা হয়, যতক্ষণ না তার দানাদার ভাব সম্পূর্ণ মিলিয়ে গিয়ে মসৃণ ও কোমল হয়ে ওঠে। গোলাপের পাপড়ি যোগ করে বাড়ানো হয় সুগন্ধ, আর শেষে এলাচের গুঁড়ো ছড়িয়ে ঠান্ডা অবস্থায় পরিবেশন করা হয়। এটি এমন এক মিষ্টি, যা ধৈর্যের দাবি করে। প্রাসাদের রান্নাঘরে সেই ধৈর্য ছিল, আর ডাকনি আজও সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেছে।
 
এর পাশাপাশি রয়েছে খুবানি কা মিঠা, যেখানে খুবানিকে ধীরে ধীরে রান্না করে জ্যামের মতো নরম করা হয় এবং তার উপর দেওয়া হয় তাজা ক্রিম; ডাবল কা মিঠা, যা সাধারণ পাউরুটিকে জাফরান-ভেজা বিলাসিতায় রূপান্তরিত করে; আর জাউজি হালুয়া, যার জায়ফলের উষ্ণ স্বাদ দীর্ঘক্ষণ মুখে লেগে থাকে। প্রতিটি রেসিপিই যেন পুরোনো শাহী রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা এক ফিসফিসানি ও আশীর্বাদ। ডাকনি এই নির্বাচিত রেসিপিগুলোকে শুধুমাত্র নতুনত্ব হিসেবে নয়, উত্তরাধিকার হিসেবে উপভোগ করার আমন্ত্রণ জানায়। নিঃসন্দেহে এটি এমন এক অভিজ্ঞতা, যা উপহার হিসেবেও দেওয়া যায়।
 
তবে ঐতিহ্য তখনই টিকে থাকে, যখন কেউ তাকে বহন করার দায়িত্ব নেয়। বহু বছর পর আসরা তাঁর দক্ষতা ও ছোট্ট কেন্দ্রীয় রান্নাঘর ভাগ করে নেন মেয়ে নায়না খুন্দমেরি-র সঙ্গে, যিনি ২০২১ সালে ডাকনি সুইট ট্রিটসের ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেন। নায়না বড় হয়েছেন বাদামের পাতলা স্তরের উপর তুষারের মতো ভেসে থাকা ভরক দেখতে দেখতে। তিনি শিখেছেন চিনির সিরার সঠিক ঘনত্ব থার্মোমিটার দিয়ে নয়, বরং তার সূক্ষ্ম সুতোর মতো টান দেখে বিচার করতে। তিনি যখন প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন, তখন ডাকনি আর শুধু আসরার স্বপ্ন ছিল না; এটি হয়ে ওঠে দুই প্রজন্মের যৌথ সাধনার এক রান্নাঘর।
 
আসরা আনজুম
 
আজ ডাকনির অবস্থান ব্যস্ত বানজারা হিলসে, যা সেই শান্ত প্রাঙ্গণগুলোর থেকে অনেক দূরে, যেখানে একসময় এই মিষ্টিগুলো প্রথম তৈরি হতো। দোকানের বাইরে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে স্কুটার। শেষ মুহূর্তের উপহারের জন্য বাক্সগুলো দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়। কেউ আসে বিয়ের আয়োজনের জন্য, কেউ আসে মিষ্টির স্বাদ নিতে, আবার কেউ আসে ঐতিহ্যের টানে। অনেকেই প্রথমবার বাদাম কি জালি দেখে বিস্মিত হন এবং আলোয় তুলে ধরে তার রূপালি ঝলক উপভোগ করেন।
 
কাজ অবশ্য আজও সহজ হয়নি। রূপার পাত এখনও ছিঁড়ে যায়, বোতললাউ এখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নেয়, আর বাদামকে এখনও নিখুঁত টেক্সচারে গুঁড়ো করতে হয়, নইলে জালি ভেঙে পড়ে। কিন্তু এটাই তো আসল বিষয়। এই মিষ্টিগুলো কখনও দ্রুত তৈরি করার জন্য ছিল না। তাদের সৌন্দর্যই লুকিয়ে আছে সময়ের দাবি করার মধ্যে। ডাকনি সেই সময়কে ছোট করতে রাজি নয়।
 
এ বছর তারা তাদের সংগ্রহে যোগ করেছে নতুন অথচ মার্জিত কিছু সংযোজন, নানখাতাই, পিস্তাচিও রেলিশ এবং ম্যাঙ্গো মেল্টের মতো আধুনিক রূপে পরিবেশিত ঐতিহ্যবাহী স্বাদ। এগুলো ভাগ করে খাওয়ার, ভ্রমণে সঙ্গে নেওয়ার কিংবা আকর্ষণীয় প্রদর্শনের জন্য আদর্শ। সমসাময়িক উদযাপনের উপযোগী হলেও এগুলোর মধ্যে রয়ে গেছে কারিগরি দক্ষতা, স্বাদ এবং খানিকটা খেয়ালিপনা। পাশাপাশি, তাদের বিশেষ ট্রে, সেভরি টিন এবং নতুন বরফি ব্লক ফরম্যাটও উদযাপনের টেবিলে বৈচিত্র্য এনে দেয়, অথচ ভারতীয় স্বাদের শিকড় থেকে বিচ্যুত হয় না।
 
১৯৯৪ সালে বিরিয়ানির জনপ্রিয়তার সমান্তরালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজ হায়দ্রাবাদের নিজস্ব পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। খাদ্য-লেখকেরা একে সাংস্কৃতিক প্রকল্প বলেন, আর গ্রাহকেরা বলেন শৈশবের স্মৃতি। আসরা ও নায়নার কাছে এটি দুটোই। ১০ বছর বয়সে হাতে তুলে নেওয়া একটি বেলন আজ মা-মেয়ের ভাগ করে নেওয়া একটি কেন্দ্রীয় রান্নাঘরে রূপ নিয়েছে। রাজকীয় রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ একটি রেসিপি আজ এমন এক বাক্সে বন্দি, যা যে কেউ বাড়িতে নিয়ে যেতে পারে।
 
 
তাদের প্যাকেজিংও অত্যন্ত যত্নসহকারে তৈরি, এমবস করা বাক্সে রয়েছে উষ্ণতা ও নস্টালজিয়ার ছোঁয়া, আর ট্রেগুলো বাড়িরই একটি অংশ হয়ে ওঠে। প্রতিটি মোড়ক, লেবেল ও বার্তায় থাকে যত্নের স্পর্শ, কখনও কখনও থাকে একটি ছোট গল্পও, যা উপহারের অর্থকে আরও গভীর করে তোলে।
 
নিজামরা আর নেই। তাঁদের খানসামারাও নেই। কিন্তু বানজারা হিলসে, দুপুরের ব্যস্ততা আর সন্ধ্যার চায়ের মধ্যবর্তী সময়েও, সেই জালির নকশা এখনও কাটা হয়। রূপার পাত এখনও স্তরে স্তরে বসানো হয়। গিল-এ-ফিরদৌস এখনও মাটির পাত্রে ঠান্ডা হতে থাকে।
 
ডাকনি সুইট ট্রিটস এই মিষ্টিগুলোর উদ্ভাবক নয়। তারা শুধু শহরকে এগুলো ভুলে যেতে দেয়নি। আর সেই কাজের মধ্য দিয়েই তারা হায়দ্রাবাদকে উদযাপনের এক নতুন কারণ উপহার দিয়েছে, শুধু জাঁকজমক নয়, এমন এক স্বাদ, যা স্মৃতিকে জীবন্ত রাখে। কারণ কিছু ঐতিহ্যের স্থান থাকে বেদির ওপর। আর কিছু ঐতিহ্যের স্থান থাকে আপনার জিভে, স্বাদের মধ্যে।


শেহতীয়া খবৰ