পুলিশের নতুন অভিযান: ‘পিঙ্ক বুথ’ ও বিশেষ টহলে আরও সুরক্ষিত হবে মহানগর কলকাতা

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 20 h ago
পুলিশের নতুন অভিযান: ‘পিঙ্ক বুথ’ ও বিশেষ টহলে আরও সুরক্ষিত হবে মহানগর কলকাতা
পুলিশের নতুন অভিযান: ‘পিঙ্ক বুথ’ ও বিশেষ টহলে আরও সুরক্ষিত হবে মহানগর কলকাতা
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী

নারী নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কলকাতা শহরে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের পথে এগোল কলকাতা পুলিশ। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা পরিষেবা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনে প্রতিদিন হাজার হাজার নারীকে দিনের পাশাপাশি গভীর রাতেও শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করতে হয়। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চালু করা হয়েছে ‘পিঙ্ক বুথ’ এবং রাস্তায় নামানো হয়েছে বিশেষ মহিলা টহলদারি গাড়ি। প্রশাসনের দাবি, এই উদ্যোগ শুধু নিরাপত্তা বাড়ানোর পদক্ষেপ নয়, বরং নারীদের মধ্যে আস্থা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
 
কলকাতা পুলিশের নতুন এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হল মহিলাদের জন্য এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে যে কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা পাওয়া সম্ভব হবে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত মোড়, গণপরিবহন কেন্দ্র, বাজার এলাকা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘পিঙ্ক বুথ’। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকায় স্থাপিত এই বিশেষ বুথগুলিতে সম্পূর্ণভাবে মহিলা পুলিশকর্মীরাই দায়িত্ব পালন করছেন। কোনও মহিলা হয়রানির শিকার হলে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে কিংবা জরুরি সাহায্যের প্রয়োজন হলে সরাসরি এই বুথে যোগাযোগ করতে পারবেন। অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে প্রাথমিক আইনি সহায়তা, নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরামর্শ এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ—সব ধরনের পরিষেবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এখানে।
 
পুলিশের একাংশের মতে, অনেক সময় সাধারণ থানায় গিয়ে অভিযোগ জানাতে নারীদের মধ্যে সংকোচ বা অনীহা দেখা যায়। সেই বাধা দূর করতেই পিঙ্ক বুথকে এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে মহিলারা নির্ভয়ে নিজেদের সমস্যার কথা জানাতে পারেন। ফলে অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া যেমন সহজ হবে, তেমনই দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।
শুধু পিঙ্ক বুথেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এই উদ্যোগ। শহরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে চালু করা হয়েছে বিশেষ মহিলা টহলদারি গাড়ি, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘শাইনিং’। এই গাড়িগুলিতে মহিলা পুলিশকর্মীরা নিয়মিত টহল দিচ্ছেন এবং বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় নজরদারি চালাচ্ছেন। বাসস্ট্যান্ড, মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মোড় এবং অপেক্ষাকৃত নির্জন পথগুলিকেও এই নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।
 
বিশেষ এই টহলদারি ব্যবস্থার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়। এর মাধ্যমে নারীদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ আরও জোরদার করাই প্রধান লক্ষ্য। কোনও মহিলা বিপদের মুখে পড়লে সরাসরি এই টহলদারি দলের সাহায্য চাইতে পারবেন। প্রয়োজনে দ্রুত উদ্ধার, নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্বও নেবে এই বাহিনী।সমাজবিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আধুনিক ও উন্নত শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হল নারী নিরাপত্তা। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়ছে, পাশাপাশি রাতের শহরেও তাঁদের উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে নিরাপত্তা পরিকাঠামোকে সময়োপযোগী ও আরও কার্যকর করে তোলা এখন প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
 
কলকাতা পুলিশের এই উদ্যোগ ইতিমধ্যেই শহরের বিভিন্ন মহলে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। কর্মজীবী মহিলা, ছাত্রী, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সাধারণ নাগরিকদের একাংশের মতে, পিঙ্ক বুথ ও মহিলা টহলদারি গাড়ির মতো পদক্ষেপ নারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। একই সঙ্গে অপরাধপ্রবণ মানসিকতার ব্যক্তিদের কাছেও এটি একটি কড়া বার্তা পৌঁছে দেবে যে নারী নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসন কোনওরকম আপস করতে রাজি নয়।
 
পুলিশ সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে, ভবিষ্যতে এই প্রকল্প আরও বিস্তৃত করা হতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা, মহিলা পুলিশ বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি এবং জনসচেতনতার সমন্বয়ে নারী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কলকাতাকে দেশের অন্যতম মডেল শহর হিসেবে গড়ে তোলাই এখন প্রশাসনের লক্ষ্য।নিরাপদ, আত্মবিশ্বাসী এবং নারী-বান্ধব শহর গড়ার পথে কলকাতা পুলিশের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। নাগরিকদের প্রত্যাশা, এই পদক্ষেপ শুধু অপরাধ প্রতিরোধেই নয়, বরং সমাজে নারীদের স্বাধীন ও নিরাপদ চলাচলের অধিকারকে আরও শক্তিশালী করবে।


শেহতীয়া খবৰ