সেপ্টিসেমিয়ায় থেমে গেল ‘মোগলি গার্ল’-এর জীবনসংগ্রাম, মাত্র ১৮ বছরেই মৃত্যু এহসাসের
দেবকিশোর চক্রবর্তী
ভারতের ‘মোগলি গার্ল’ নামে পরিচিত এহসাসের জীবনসংগ্রামের অবসান হল মাত্র ১৮ বছর বয়সে। ফুসফুসের সংক্রমণ থেকে সৃষ্ট সেপ্টিসেমিয়ায় মৃত্যু হয়েছে তার। দীর্ঘদিন জঙ্গলে বসবাস করে মানুষের সমাজে ফিরে আসা এই কিশোরীর গল্প একসময় গোটা দেশকে আবেগাপ্লুত করেছিল।
২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশের বাহরাইচ জেলার কাতারনিয়াঘাট অভয়ারণ্যের জঙ্গল থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। তখন তার বয়স ছিল প্রায় আট থেকে দশ বছর। উদ্ধারকালে দেখা যায়, সে মানুষের মতো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারত না; দুই হাত ও দুই পায়ের সাহায্যে চলাফেরা করত। মানুষের ভাষা, সামাজিক আচরণ কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপনের সঙ্গে তার প্রায় কোনও পরিচয় ছিল না।
উদ্ধারের পর বাহরাইচের চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি তার পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেয়। প্রথমে তার নাম রাখা হয় 'পূজা'। পরে তাকে লখনউয়ের 'নির্বাণ বালগৃহ'-এ স্থানান্তরিত করা হয় এবং নতুন নাম দেওয়া হয় 'এহসাস'। সেখানেই শুরু হয় তার নতুন জীবন।দীর্ঘ চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ এবং স্নেহময় পরিচর্যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের সমাজের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে শুরু করেছিল এহসাস। সে পোশাক পরতে শিখেছিল, পরিচিত মানুষদের চিনতে পারত এবং স্নেহ-ভালোবাসার প্রতিও সাড়া দিত। যে মহিলা তার দেখাশোনা করতেন, তাকে সে স্নেহভরে "আম্মা" বলে ডাকত।
কিন্তু কিছুদিন আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে এহসাস। তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। গত ১৫ জুন তাকে লখনউয়ের রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়।ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানা যায়, ফুসফুসের সংক্রমণ থেকে ব্যাকটেরিয়া রক্তে ছড়িয়ে পড়ে সেপ্টিসেমিয়া হয়েছিল তার। চিকিৎসকদের একাংশের মতে, দীর্ঘদিন জঙ্গলের পরিবেশে বসবাস করার ফলে তার শরীর সেই পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। পরবর্তীকালে জনবহুল এলাকায় এসে নতুন ধরনের জীবাণু, দূষণ ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে মানিয়ে নিতে না পারার কারণেও তার শারীরিক দুর্বলতা বেড়ে যেতে পারে।
জঙ্গলের অন্ধকার থেকে মানুষের সমাজে ফিরে আসার এক অসাধারণ লড়াইয়ের নাম ছিল এহসাস। বহু প্রতিকূলতাকে জয় করে সে নতুন করে বাঁচতে শিখেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক কঠিন অসুখের কাছে হার মানতে হল তাকে।
মাত্র ১৮ বছর বয়সেই থেমে গেল ‘মোগলি গার্ল’-এর জীবনযুদ্ধ। তবে তার গল্প মানবিকতা, স্নেহ এবং পুনর্বাসনের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।